তৃতীয় পর্ব:
তৃতীয়বার যখন আমি কারাগারে গেলাম, তখন মনে হচ্ছিল—আমি যেন আর শুধু একজন দর্শক নই।
আমি ধীরে ধীরে এই গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়ছি।
বাইরের পৃথিবীতে শওকত মাহমুদের নাম এখনও উচ্চারিত হয়—কেউ শ্রদ্ধায়, কেউ সমালোচনায়, কেউবা নিছক কৌতূহলে।
কিন্তু এই লোহার দেয়ালের ভেতরে তিনি শুধু একজন কয়েদি—একটা নম্বর, একটা নাম, একটা নিঃশ্বাস।
আজ তাকে দেখেই মনে হলো, আগের দুই দিনের চেয়েও বেশি ক্লান্ত।
তিনি মেঝেতে হেলান দিয়ে বসেছিলেন, চোখ দুটো আধবোজা।
মনে হচ্ছিল, যেন ভেতরের কোনো ভার তাকে নিচের দিকে টেনে নিচ্ছে।
আমি কাছে যেতেই তিনি চোখ খুললেন।
“এসেছ?”—কণ্ঠে আজ আর আগের মতো শক্তি নেই।
আমি বসে পড়লাম তার পাশে।
“আপনি কেমন আছেন?”
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
“এই প্রশ্নটা এখানে খুব অদ্ভুত শোনায়।”
তার কথায় আমি একটু থেমে গেলাম।
“তবুও বলুন…”
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
“আমি বেঁচে আছি। এটুকুই যথেষ্ট।”
তার কণ্ঠে এক ধরনের নিঃসঙ্গতা ছিল—যা শব্দে প্রকাশ করা কঠিন।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর তিনি নিজেই কথা শুরু করলেন।
“জানো, মানুষ যখন ভাঙে, তখন সে শব্দ করে না…”
আমি চমকে তার দিকে তাকালাম।
“বাইরে থেকে কেউ বুঝতেও পারে না। ভাঙনটা ভেতরে ভেতরে ঘটে—নিঃশব্দে।”
আমি ধীরে ধীরে বললাম,
“আপনি কি ভেঙে পড়েছেন?”
তিনি মাথা নাড়লেন।
“না। পুরোপুরি না। কিন্তু ফাটল ধরেছে।”
তার এই স্বীকারোক্তি শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হয়ে গেল।
এই মানুষটা, যিনি একসময় এত দৃঢ় ছিলেন, আজ নিজেই নিজের ভাঙনের কথা বলছেন।
“কেন জানো?”—তিনি আবার বললেন—
“কারাগারে শারীরিক কষ্টের চেয়ে মানসিক কষ্টটা বেশি। এখানে কেউ তোমার পাশে থাকে না। সবাই নিজের মতো লড়াই করে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“আপনার কি কাউকে খুব মনে পড়ে?”
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
“মানুষকে না… সময়কে।”
আমি অবাক হলাম।
“সময়?”
তিনি মাথা নেড়ে বললেন,
“হ্যাঁ। সেই সময়, যখন আমি স্বাধীন ছিলাম… সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম… নিজের মতো করে বাঁচতে পারতাম।”
তার চোখে হঠাৎ এক ধরনের আক্ষেপ ফুটে উঠল।
“এখন বুঝি, স্বাধীনতা কত বড় জিনিস।”
কথাগুলো আমার ভেতরে গভীরভাবে ধাক্কা দিল।
আমরা যারা বাইরে আছি, আমরা কখনোই স্বাধীনতার আসল মূল্য বুঝি না—যতক্ষণ না সেটা হারিয়ে ফেলি।
“আপনি কি কখনও মনে করেন, আবার আগের জীবনে ফিরে যাবেন?”—আমি জিজ্ঞেস করলাম।
তিনি একটু হেসে বললেন,
“আগের জীবন?”
তারপর মাথা নাড়িয়ে বললেন,
“না। মানুষ কখনোই আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারে না। সময় সবকিছু বদলে দেয়।”
তিনি একটু থামলেন।
“যদি কখনো বের হতে পারি… তাহলে হয়তো নতুন করে শুরু করব।”
আমি আগ্রহ নিয়ে বললাম,
“কীভাবে?”
তিনি দূরে কোথাও তাকিয়ে বললেন,
“নিঃশব্দে। আলো থেকে দূরে। শুধু নিজের মতো করে বাঁচব।”
এই কথাগুলো শুনে আমি বুঝতে পারলাম—
এই মানুষটা বদলে গেছেন।
রাজনীতির কোলাহল, ক্ষমতার উত্তাপ—সবকিছু যেন তাকে ক্লান্ত করে দিয়েছে।
এখন তিনি শুধু শান্তি চান।
হঠাৎ তিনি আমার দিকে তাকালেন।
“তুমি কি লিখছো?”
আমি একটু থমকে গেলাম।
“কী লিখছি?”
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
“আমার গল্প।”
আমি কিছু বললাম না।
কারণ সত্যিই আমি তার গল্প লিখছিলাম—
শুধু কাগজে না, নিজের ভেতরেও।
“লিখো,”—তিনি বললেন—
“কিন্তু একটা কথা মনে রেখো…”
আমি তাকালাম তার দিকে।
“আমাকে নায়ক বানানোর দরকার নেই। আমি শুধু একজন মানুষ—যে ভুল করেছে, শিখেছে, আর এখন মুক্তি চায়।”
তার কথাগুলো আমার ভেতরে গেঁথে গেল।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
আজ আর কিছু বলার ছিল না।
কারাগারের দরজা দিয়ে বের হয়ে আসার সময় মনে হচ্ছিল—
আমি শুধু একজন মানুষের গল্প লিখছি না, আমি একটা সময়ের ভাঙনের ইতিহাস লিখছি।
আর সেই ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় একটাই শব্দ বারবার ফিরে আসছে—
মুক্তি।
(চলবে…)