ঢাকা, শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০২:২৬:১৫ AM

রিজভী ও বিএনপির ১৭ বছরের বাস্তবতা

মান্নান মারুফ
31-03-2026 11:05:15 AM
রিজভী ও বিএনপির ১৭ বছরের বাস্তবতা

তিনবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা বিএনপি মত দলের প্রথম সারির শত শত নেতা থাকলেও, রুহুল কবির রিজভীসহ হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া সাধারণ কর্মীরা কাউকেই কাছে পেত না। দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন, জেল এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের সময়ে বিএনপি বলতে এক কথায় মানুষ রিজভীকেই বুঝত। তিনি ছিলেন সেই নেতা, যিনি দলের কার্যক্রমে সর্বদা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন এবং সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত সংযোগ রাখতেন।

দলের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর বিরুদ্ধে ১৮০টি মামলা রয়েছে। এছাড়া বিএনপির চেয়ারম্যানের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান (শিমুল বিশ্বাস) ১১৯টি মামলার সম্মুখীন হয়েছেন। যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা, অ্যাডভোকেট মজিবুর রহমান সরোয়ারের ১৪টি, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন (আলাল) ২৫৪টি মামলা সহ অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের করা হয়েছে।

নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা সংখ্যা যেমন বিস্তৃত, তেমনি দলের সাধারণ ও নির্যাতিত কর্মীদেরও মামলা দায়েরের সংখ্যা প্রায় এক লাখ ৩৮ হাজার ৭১। এসব মামলার আসামি সংখ্যা চার লাখের ওপরে। বিএনপি চেয়ারপারসন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিব ছাড়াও স্থায়ী কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ৭টি, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের ৪টি,। মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে ৪৮টি, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে ৩২টি, নজরুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে ৬টি, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ৬টি মামলা করা হয়েছে।

চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে আমান উল্লাহ আমানের বিরুদ্ধে ১৩৪টি মামলা, মিজানুর রহমান মিনুর ১৮টি, জয়নাল আবেদীন ফারুকের ১২টি এবং প্রফেসর জয়নাল আবেদনীনের ৭টি মামলা দায়ের রয়েছে। ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমানের বিরুদ্ধে ৩টি,  মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদের ৫টি মামলা রয়েছে। এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী ১১টি, বরকত উল্লাহ বুলু ১৩৫টি, মো. শাহজাহান ১৭টি এবং আব্দুস সালাম পিন্টু ১৯টি মামলা মোকাবিলা করছেন।

দলের অন্যান্য সিনিয়র নেতাদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম ৪৯টি, এম কে আনোয়ার ১৯টি, ব্রি. জে. (অব.) আ স ম হান্নান শাহ ৪১টি, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ ২৮টি মামলা রয়েছে। ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ৪টি এবং সাদেক হোসেন খোকা ২৭টি মামলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তারা এখন আর বেচেঁ নেই। 

দলের সাংগঠনিক সম্পাদক, বিশেষ সম্পাদক, প্রচার সম্পাদক এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধেও অসংখ্য মামলা রয়েছে। সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদের বিরুদ্ধে ৪১টি, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর ৪৭টি, বহিষ্কৃত সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জুর ১৯টি, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের ৩টি মামলা দায়ের হয়েছে। প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীর বিরুদ্ধে ৪৭টি, তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলালের বিরুদ্ধে ১৭টি, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপুরের বিরুদ্ধে ৮৭টি মামলা।

ঢাকা মহানগর, রাজশাহী ও অন্যান্য অঞ্চলের সাবেক এবং বর্তমান নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে আরও অসংখ্য মামলা রয়েছে। ঢাকা মহানগরের ৫০ থানায় ১৭ হাজার ৫৮৩টি মামলা করা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন বিএনপি নেতারা। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, দলের কার্যক্রমে কর্মীদের প্রতি কতটা জটিলতা ও ঝুঁকি ছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই রিজভীসহ অনেক নির্যা তিত নেতাদের নাম বিএনপির সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রভাব ক্রমেই কমতে শুরু করেছে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, দলের অভিজ্ঞ নেতা-কর্মীরাও এখন ঐ সব নির্যাতিত  নেতাদের প্রভাব ও স্মৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। এই পরিবর্তনে দলের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও নেতৃত্বের অনিশ্চয়তার প্রতিফলন ঘটছে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

গত ১৭ বছর বিরোধীদল হিসেবে বিএনপির কর্মীদের যাওয়ার জন্য কার্যকর কোনো স্থান বা সুযোগ ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে হাতে ঘোনা দু একজন থাকলেও তখন একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছেন সাংবাদিক, দলের  সাধারণ কর্মী এবং তাদের স্বজনদের দেখাশোনা করার। তার এই প্রভাব দলের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং সাধারণ কর্মীদের আশ্বাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কিন্তু ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই সাধারণ কর্মীরা তার কথা ভুলতে বসেছেন। অনেক নেতা ও কর্মী সচেতনভাবে তার নাম এড়িয়ে চলছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি দলের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও ক্ষমতার বিভাজনের প্রতিফলন।

দলের অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষকরা জানান, বিএনপির অন্যান্য নেতা-কর্মীরা ক্ষমতার বাইরে থেকে দলের কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। মন্ত্রীপরিষদ গঠনের পরও একাধিক নেতা দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তবে তাদের কার্যক্রম এখনও সীমিত। এর ফলে দলের সাধারণ ও নির্যাতিত কর্মীরা হতাশ ও বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়েছেন।

নির্যাতিত নেতা-কর্মীরা এখনও সেই রিজভীকেই সন্ধান করছেন। কারণ তারা জানেন, যারা সুবিধাজনক পদে পৌঁছেছেন, তারা অনেকেই নির্যাতিত কর্মীদের চিনতে পারছেন না, নামও জানেন না। এই বাস্তবতা দলের অভ্যন্তরীণ দূরত্ব এবং বিভ্রান্তির কারণ। দীর্ঘদিন আন্দোলন ও সংগ্রামে নিয়োজিত কর্মীরা আজ একধরণের অবমূল্যায়ন এবং হতাশার মুখোমুখি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করান, রিজভীর দ্রুত নেতৃত্ব প্রদানের ধরন দলের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব তৈরি করেছে। একদিকে সুবিধাজনক পদে থাকা নেতা-কর্মীরা নিজেদের অবস্থান সংরক্ষণে ব্যস্ত; অন্যদিকে সাধারণ ও নির্যাতিত কর্মীরা তাদের অবহেলা ও দূরত্বের কারণে হতাশ। দীর্ঘদিনের সংগ্রামের মূল্যায়ন না হওয়া এবং অভিজ্ঞ কর্মীদের অবমূল্যায়নের কারণে দলের ভিতরে ক্রমেই অসন্তোষ এবং দূরত্ব বেড়েছে।

একজন অভিজ্ঞ নেতা বলেন,

“আমাদের অনেকের নাম আজ অনেকেই মনে রাখতে পারছে না। যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা অনেকেই সাধারণ কর্মীদের চিনতে পারছেন না। রিজভী ছিলেন একমাত্র, যিনি সাধারণ ও নির্যাতিত কর্মীদের দিকে  বিপদের দিনগুলোতে নজর দিয়েছিলেন।”

দলের সাধারণ কর্মীরাও মনে করেন, রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য রিজভী এক ধরণের আশ্রয় ও দিকনির্দেশক ছিলেন। ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েক মাসেই তার প্রভাব কমতে শুরু করেছে, যা দলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও নেতাদের মধ্যে দূরত্বকে আরও প্রকট করেছে।

নির্যাতিতরা জানাচ্ছেন, তারা এখনও রিজভীর পাশে দাঁড়ানোর আশা রাখেন। তারা মনে করেন, যারা সুবিধাজনক পদে পৌঁছেছেন, তারা সাধারণ কর্মীদের বিষয়গুলো মনে রাখবেন এবং যথাযথ সম্মান দেবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা অনেকেই দলের সাধারণ ও নির্যাতিত কর্মীদের সঙ্গে সংযোগ রাখতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দলের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার একটি বড় কারণ হলো দীর্ঘদিনের কর্মীদের অবমূল্যায়ন। যারা আন্দোলন, জেল এবং সংগ্রামে দীর্ঘদিন নিয়োজিত ছিলেন, তাদের অবদান আজও অনেক নেতা বা কর্মী জানেন না। এই অবমূল্যায়ন দলের ভিতরে দূরত্ব এবং বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।

এসময় দেখা যায়, দলের পরীক্ষিত ও নির্যাতিত কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘদিনের সংগ্রামের পরও তাদের অবদান স্বীকৃত হয়নি। এর ফলে রাজনৈতিক আন্দোলন ও ব্যক্তিগত হতাশা জড়িয়ে গেছে। দলের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা এবং নেতৃত্বের অপ্রতুলতার কারণে হতাশা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করান, রিজভীর উদাহরণ দলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে, রাজনৈতিক ক্ষমতা শুধু অর্জন করলেই হবে না; সেটার ব্যবহার, সততা, দায়িত্ববোধ এবং দলের সাধারণ কর্মীদের প্রতি মনোযোগের সঙ্গে করতে হবে। তা না হলে দলের ভিতরে অসন্তোষ, হতাশা এবং বিচ্ছিন্নতা তৈরি হবে।

আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, দলের পরীক্ষিত ও নির্যাতিত কর্মীরা হতাশ এবং বিভ্রান্ত। তারা দীর্ঘদিন ধরে যে সংগ্রাম করেছেন, তা তাদের কাছে প্রমাণের মতো রয়ে গেছে। রিজভী তাদের কাছে শুধুই একটি প্রতীক, যার মাধ্যমে তারা এখনো আশা ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে বসবাস করছেন।বিএনপির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও সংগ্রামের স্বীকৃতি, সাধারণ ও নির্যাতিত কর্মীদের অবদানকে সম্মান জানানো এবং নেতৃত্বের দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করা ছাড়া দলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন।