পঞ্চম পর্ব:
কারাগারে আসার পর থেকে আমি বুঝতে শিখেছি—
সব শিকল চোখে দেখা যায় না।
কিছু শিকল থাকে অদৃশ্য,
যেগুলো মানুষকে আরও গভীরভাবে বেঁধে রাখে।
সেদিন যখন আমি আবার শওকত মাহমুদের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম,
তখন তিনি একা ছিলেন না।
তার পাশে আরও দু’জন বসে ছিলেন—
দু’জনই সাংবাদিক।
তাদের চোখে একই ক্লান্তি, একই নীরবতা,
আর একই প্রশ্ন—
“আমরা এখানে কেন?”
আমি কাছে যেতেই শওকত মাহমুদ মৃদু হেসে বললেন,
“আজ তোমাকে শুধু আমার গল্প শোনাবো না…
আজ শুনবে আমাদের গল্প।”
আমি নিঃশব্দে বসে পড়লাম।
একজন কথা বলা শুরু করলেন।
“আমি লিখেছিলাম একটা প্রতিবেদন…
সত্যি কথা।
কিন্তু সেই সত্যিটাই আমার অপরাধ হয়ে গেল।”
তার কণ্ঠে কোনো উত্তেজনা ছিল না—
ছিল এক ধরনের নির্লিপ্ততা,
যেন অনেকদিন আগেই তিনি সব অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছেন।
আরেকজন ধীরে ধীরে বললেন,
“আমি শুধু প্রশ্ন করেছিলাম।
কিন্তু এই দেশে কখনো কখনো প্রশ্ন করাটাও অপরাধ হয়ে যায়।”
কথাগুলো শুনে আমার বুকটা ভারী হয়ে উঠল।
শওকত মাহমুদ চুপচাপ তাদের কথা শুনছিলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
“আমরা সবাই একেকটা গল্প।
কিন্তু বাইরে কেউ আমাদের পুরো গল্পটা শোনে না।”
আমি অনুভব করলাম—
এই কারাগারের ভেতরে শুধু মানুষ বন্দি নয়,
বন্দি হয়ে আছে অসংখ্য অজানা গল্প।
“তুমি লিখবে তো?”—প্রথম জন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম।
কারণ আমি জানতাম—
এই গল্পগুলো শুধু লেখা না,
এই গল্পগুলো বলা প্রয়োজন।
শওকত মাহমুদ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“দেখো, আমাদের সবার নাম হয়তো মানুষ মনে রাখবে না।
কিন্তু আমাদের সত্যিটা যেন হারিয়ে না যায়।”
তার কণ্ঠে এক ধরনের দৃঢ়তা ছিল।
“আমরা অপরাধী নই,”—তিনি বললেন—
“আমরা শুধু আমাদের কাজটা করেছি।”
কথাগুলো ঘরের ভেতর প্রতিধ্বনির মতো ফিরে আসছিল।
আমি অনুভব করলাম—
এই মানুষগুলো শুধু নিজেদের জন্য লড়ছে না,
তারা লড়ছে একটা সত্যের জন্য,
একটা স্বাধীনতার জন্য।
হঠাৎ একজন বললেন,
“তুমি কি জানো, সবচেয়ে কষ্টের কী?”
আমি তাকালাম তার দিকে।
“বাইরে আমাদের পরিবার আছে…
তারা অপেক্ষা করছে।
কিন্তু আমরা জানি না, কখন ফিরে যেতে পারব।”
তার চোখে জল এসে গেল।
আমি আর তাকাতে পারছিলাম না।
শওকত মাহমুদ ধীরে ধীরে তার কাঁধে হাত রাখলেন।
“একদিন আমরা সবাই বের হবো,”—তিনি বললেন—
“হয়তো দেরি হবে, কিন্তু সত্য কখনো চিরদিন চাপা থাকে না।”
তার কণ্ঠে আবার সেই আগের দৃঢ়তা ফিরে এসেছে।
আমি বুঝতে পারলাম—
এই মানুষটা শুধু নিজের জন্য না,
এখন অন্যদের জন্যও শক্তি হয়ে উঠেছেন।
কারাগারের সেই ছোট্ট ঘরটায়
হঠাৎ একটা অদ্ভুত শক্তি অনুভব করলাম।
যেন দেয়ালগুলোও শুনছে,
শিকলগুলোও কাঁপছে।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
আজ আমার চোখে জল।
কিন্তু এই জল দুর্বলতার না—
এটা একটা প্রতিজ্ঞার জল।
আমি জানি, এই গল্পগুলো আমি লিখব।
কারণ এই গল্পগুলো শুধু কয়েকজন মানুষের না—
এটা একটা সময়ের গল্প,
একটা সংগ্রামের গল্প,
একটা মুক্তির আকাঙ্ক্ষার গল্প।
কারাগার থেকে বের হয়ে আসার সময়
আমার মনে হচ্ছিল—
মুক্তি শুধু একজনের না,
মুক্তি সবার।
আর সেই মুক্তির জন্যই
এই গল্পের নাম—
মুক্তিচাই।
(চলবে…