ঢাকা, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১২:১১:৩০ AM

এনবিআরের চেয়ারম্যান ‘রিপন’ ও কিছু স্মৃতি

হেলাল উদ্দিন
02-07-2026 01:38:41 PM
এনবিআরের চেয়ারম্যান ‘রিপন’ ও কিছু স্মৃতি

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আহসান হাবীব ‘রিপন’। তাঁর এই দায়িত্ব গ্রহণের খবর আমাকে বহু বছর আগের এক কঠিন সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। এটি কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তার পদোন্নতির গল্প নয়; আমার জীবনের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই এবং একজন সৎ কর্মকর্তার নৈতিক সাহসের স্মৃতিও এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

সময়টা ২০১৪ সাল। বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার পুনরায় ক্ষমতায় আসে। সে সময় এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা নজিবুর রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই, আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, তিনি আমার প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রদর্শন করেন।

তখন আমি দৈনিক যুগান্তর-এর বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। এনবিআরের একটি আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বহু সাংবাদিকের উপস্থিতিতে নজিবুর রহমান আমাকে প্রকাশ্যে অপমান করেন এবং আমার বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দেন। ঘটনাটি সাংবাদিক সমাজে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করে।

আমার দাবি অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর তিনি যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান, মরহুম নুরুল ইসলাম বাবুলকে এনবিআরে ডেকে পাঠিয়ে আমাকে যুগান্তর থেকে চাকরিচ্যুত করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। তবে সে সময় পত্রিকা কর্তৃপক্ষ আমার পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়। সম্পাদকীয় নীতির প্রতি আস্থা রেখে তারা পেশাগত দায়িত্ব পালনে আমাকে উৎসাহিত করেন। ৥ হেলাল উদ্দিন, সিনিয়র সাংবাদিক।

পরবর্তী সময়ে আমি নজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অসঙ্গতি নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকি। সেই কঠিন সময়ে এনবিআরের আয়কর বিভাগের তৎকালীন যুগ্ম কর কমিশনার আহসান হাবীব ‘রিপন’ আমাকে নৈতিকভাবে সাহস জুগিয়েছিলেন। তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি পেশাগত সহযোগিতা করতেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন থাকার প্রেরণা দিতেন।

আমাদের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল পারস্পরিক আস্থা ও পেশাগত বিশ্বাসের ভিত্তিতে। বয়সে তিনি আমার চেয়ে ছোট হলেও সংকটময় সময়ে তাঁর নৈতিক দৃঢ়তা আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।

আমার ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তর ব্যবহার করে আমার বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করা হয়। দীর্ঘ ১৪ বছর যুগান্তর-এ কর্মরত থাকার পর আমি চাকরি হারাই। এরপর আমার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয় এবং আমাকে কারাবাসও করতে হয়। তবে শেষ পর্যন্ত আদালতে প্রতিটি মামলায় আমি খালাস লাভ করি।

আমার অভিযোগ, সে সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দীর্ঘদিন দেশের কোনো মূলধারার সংবাদমাধ্যমে কাজ করার সুযোগ পাইনি। সরকারের অলিখিত নিষেধাজ্ঞার কারণে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম আমাকে নিয়োগ দিতে অনাগ্রহী ছিল। ফলে সাংবাদিকতা পেশায় দীর্ঘ সময় কার্যত নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়েছে।

শুধু আমি নই, আমার সঙ্গে পেশাগত বা ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠ ছিলেন—এমন কয়েকজন এনবিআর কর্মকর্তাকেও হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছিল বলে আমি প্রত্যক্ষ করেছি। তাঁদের মধ্যে বর্তমান চেয়ারম্যান আহসান হাবীবও একজন।

আমার বক্তব্য অনুযায়ী, নজিবুর রহমান চেয়ারম্যান থাকাকালে তাঁর স্ত্রীর আয়কর-সংক্রান্ত একটি ফাইলে প্রায় ৬০ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সে সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর কর্মকর্তা হিসেবে আহসান হাবীব বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানান এবং প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ছাড়া ফাইলটির কার্যক্রম এগোতে দেননি। এর ফলে তাঁকে তাৎক্ষণিক বদলি, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে অপসারণ এবং দীর্ঘ সময় পেশাগত বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছিল বলে জানা যায়।

একই সময়ে আমার সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণেই এনবিআরের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সদস্য জাহানারা সিদ্দিকাকেও নানা ধরনের প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

সময়ের প্রবাহে আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। একসময় ক্ষমতার শীর্ষে থাকা নজিবুর রহমান বর্তমানে দুর্নীতির মামলায় কারাগারে রয়েছেন। অন্যদিকে, দীর্ঘ প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সততা, দক্ষতা ও পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি হিসেবে আহসান হাবীব ‘রিপন’ আজ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।

জীবনের এই বৈপরীত্য আমাকে বারবার ভাবায়। ক্ষমতা কখনোই চিরস্থায়ী নয়; কিন্তু সততা, নৈতিকতা এবং পেশাগত নিষ্ঠা শেষ পর্যন্ত নিজের মূল্য প্রতিষ্ঠা করে। যারা ক্ষমতার দম্ভে অন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল, সময় তাদেরও কঠিন বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আর যারা প্রতিকূলতার মধ্যেও নীতির সঙ্গে আপস করেননি, শেষ পর্যন্ত তারাই সম্মান ও স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।

এই অভিজ্ঞতা আমার কাছে কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয়; এটি একটি সময়ের দলিল। একজন সাংবাদিক হিসেবে সত্য অনুসন্ধানের মূল্য যে কত কঠিন হতে পারে, সেই বাস্তবতার সাক্ষী আমি নিজেই। একই সঙ্গে এটি এমন একজন সৎ সরকারি কর্মকর্তার গল্প, যিনি চাপের মুখেও দায়িত্ব ও বিবেকের সঙ্গে আপস করেননি।

ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—ক্ষমতার অহংকার ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সততা ও নৈতিক সাহসের উত্তরাধিকার দীর্ঘস্থায়ী। সময়ের বিচারে মানুষ নয়, মানুষের কর্মই শেষ পর্যন্ত মূল্যায়িত হয়। সেই বিশ্বাসই আজও আমাকে শক্তি জোগায়।