রাজধানী ঢাকায় দিন দিন ছিনতাইয়ের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রতিদিনই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই, ছিনতাইয়ের সময় হামলা এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে গভীর রাত ও ভোরের দিকে বাসস্ট্যান্ড, মহাসড়কসংলগ্ন এলাকা এবং নির্জন সড়কগুলোতে ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও রাজধানীতে সক্রিয় ছিনতাইকারী চক্র নিয়ন্ত্রণে আনতে এখনো হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশকে।
সম্প্রতি রাজধানীতে আলোচিত দুটি ছিনতাইয়ের ঘটনা নগরবাসীকে আরও আতঙ্কিত করেছে। গত ৭ জুন দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন একটি ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা সোহেলি ইসলাম (৪২)। ভোরে গাবতলীতে বাস থেকে নেমে রিকশাযোগে বাসায় ফেরার পথে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী তার ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। টানাহেঁচড়ার একপর্যায়ে তিনি চলন্ত রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন। তার ডান হাত ভেঙে যায় এবং মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। হাসপাতালে চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১১ জুন তিনি মারা যান।
একই ধরনের আরেকটি ঘটনায় রাজধানীর উত্তরা এলাকার বাসিন্দা মুক্তা আক্তার (২১) প্রাণ হারান। ঈদুল ফিতরের দুই দিন আগে কেনাকাটার উদ্দেশ্যে অটোরিকশায় করে যাওয়ার সময় উত্তরা দক্ষিণ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি প্রাইভেটকার থেকে তার ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ব্যাগের টানে তিনি সড়কে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এ ধরনের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। প্রতিনিয়ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল ফোন, ব্যাগ, টাকা-পয়সা ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা থানায় মামলা না করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন অথবা অভিযোগই দায়ের করেন না। ফলে প্রকৃত অপরাধের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয় না।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত রাজধানীর ৫০টি থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় মোট ৪১৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৪টি মামলা হয়েছে আগস্ট মাসে এবং সবচেয়ে কম ২৫টি মামলা হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসে। বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে তেজগাঁও বিভাগে সর্বোচ্চ ১০৬টি এবং লালবাগ বিভাগে সর্বনিম্ন ১৭টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এছাড়া ওয়ারীতে ৯১টি, মতিঝিলে ৭৩টি, মিরপুরে ৩৯টি, রমনায় ৩৪টি, উত্তরা বিভাগে ৩০টি এবং গুলশানে ২৮টি মামলা হয়েছে।
ডিএমপির তথ্যমতে, বর্তমানে রাজধানীতে সক্রিয় ছিনতাইকারীর সংখ্যা ১ হাজার ৩৮৭ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩০৮ জন ওয়ারী বিভাগে রয়েছে। তেজগাঁও ও উত্তরা বিভাগে রয়েছে ২৪০ জন করে, মতিঝিলে ১৬৮ জন, লালবাগে ১৫৯ জন, রমনায় ১৫২ জন, গুলশানে ৬৭ জন এবং মিরপুরে ৫৩ জন। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, এসব ছিনতাইকারীর প্রায় ৮০ শতাংশই একাধিক মামলার আসামি।
ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দিন সামীর মতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ডেমরা এক্সপ্রেসওয়ে এবং ভোরবেলায় দূরপাল্লার যাত্রীদের চলাচল বেশি হওয়ায় ওই এলাকায় ছিনতাইয়ের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। যানজটে আটকে থাকা গাড়ির জানালা দিয়ে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। তিনি জানান, চলতি বছরের মে মাসে ১৩৮ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে অনেকেই অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদেরও হামলার শিকার হতে হচ্ছে। গত ১৬ জুন রাজধানীর আদাবরে একটি দোকানে চাপাতি ঠেকিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনার পর অভিযান চালাতে গিয়ে ছিনতাইকারীদের হামলায় আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম ও উপ-পরিদর্শক (এসআই) তরুণ কুমার গুরুতর আহত হন। পরে পুলিশের পাল্টা অভিযানে দুই ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধ এবং চারজনকে আটক করা হয়।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, বর্তমানে চুরি ও ছিনতাইকে সাধারণ জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সময় শেষ হয়েছে। তার মতে, এখন এসব অপরাধে পেশাদার ও সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে। অনেক অপরাধীর হাতে দেশীয় অস্ত্র থাকে এবং তাদের একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত। ফলে ছিনতাইয়ের সময় শুধু সম্পদ লুট নয়, অনেক ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ড ও গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু মাঠপর্যায়ের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। ছিনতাইকারী চক্রের মূল হোতা, পৃষ্ঠপোষক এবং সংঘবদ্ধ গ্যাংয়ের নেতৃত্বদানকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি থানায় ছিনতাইয়ের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে মামলা গ্রহণ এবং বিচারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
অন্যদিকে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ইবনে মিজান জানান, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্লক রেইড এবং বিশেষ অভিযান আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে মোহাম্মদপুরসহ অপরাধপ্রবণ এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আশপাশের জেলা থেকে এসে অপরাধ সংঘটিত করে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, অপরাধ প্রতিরোধে বিট পুলিশিং, নিয়মিত টহল, নজরদারি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জনবহুল শহর হওয়ায় বিদ্যমান জনবল ও যানবাহন দিয়ে সব এলাকায় কার্যকর নজরদারি বজায় রাখা কঠিন। তার মতে, পুলিশের জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রয়োজনীয় যানবাহন বৃদ্ধি করা গেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান জোরদারের পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধি, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় ছিনতাইয়ের মতো সহিংস অপরাধ নগরবাসীর নিরাপত্তার জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।