ঢাকা, সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০২:০৫:২৬ AM

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে দুর্নীতির উৎসব

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
16-08-2026 08:45:41 PM
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে দুর্নীতির উৎসব

পেট্রোবাংলার আওতাধীন জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডে ওভারটাইমের নামে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কোম্পানিটির গত মে মাসের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩৬ লাখ ৫১ হাজার ৭০৫ টাকা। একই মাসে ওভারটাইম বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩৫ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৬ টাকা। অর্থাৎ বেতনের প্রায় সমপরিমাণ অর্থই ব্যয় হয়েছে ওভারটাইমে।

বেতন শিট অনুযায়ী, কোনো কোনো কর্মচারীর নামে মাসে ১৫০ থেকে ২১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত ওভারটাইম দেখানো হয়েছে। এর বিপরীতে ৩৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর মূল বেতনের দেড় থেকে দুই গুণ।

কোম্পানির হরিপুর ফিল্ডে কর্মরত ফোরম্যান ফয়জুল করিমের মূল বেতন ২৬ হাজার ১০০ টাকা। মে মাসে তার নামে ২১৫ ঘণ্টা ওভারটাইম দেখিয়ে ৫৩ হাজার ৯৫৭ টাকা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে তিনি ৯৮ হাজার ২০২ টাকা বেতন পেয়েছেন। রশিদপুর সিআরইউ প্ল্যান্টের সাদেক আলীর মূল বেতন ২৫ হাজার ৩২০ টাকা। তিনি ১৭৬ ঘণ্টা ওভারটাইম বাবদ ৪২ হাজার ৮৫০ টাকাসহ মোট ৮৭ হাজার ৯২৬ টাকা পেয়েছেন।

কৈলাশটিলা ফিল্ডের লোকমান উদ্দিনের মূল বেতন ২০ হাজার ৩৯০ টাকা। তার নামে ২১২ ঘণ্টা ওভারটাইম দেখিয়ে ৪১ হাজার ৫৬৫ টাকা দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে তিনি পেয়েছেন ৭৭ হাজার ৭৯৫ টাকা। প্রধান কার্যালয়ের কর্মচারী নূর উদ্দিনের মূল বেতন ২৮ হাজার ৭৯০ টাকা। তিনি ১৫০ ঘণ্টা ওভারটাইম বাবদ ৪১ হাজার ৫২৫ টাকাসহ মোট ৮৯ হাজার ৪৪০ টাকা পেয়েছেন। রশিদপুর গ্যাস ফিল্ডের মো. আবদুল ওয়াদুদের মূল বেতন ২৬ হাজার টাকা। ১৬৫ ঘণ্টা ওভারটাইমের বিপরীতে তিনি পেয়েছেন ৪১ হাজার ২৫০ টাকা এবং মোট বেতন উত্তোলন করেছেন ৮৫ হাজার ৮৫৫ টাকা।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অতিরিক্ত ওভারটাইমের কারণে অনেক কর্মচারী বিভিন্ন গ্রেডের কর্মকর্তাদের চেয়েও বেশি অর্থ পাচ্ছেন। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শৃঙ্খলাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মে মাসের হিসাবে উপব্যবস্থাপক (ষষ্ঠ গ্রেড) এমরানুল হক চৌধুরী সর্বসাকল্যে ৫৯ হাজার ১৮৮ টাকা এবং সহকারী ব্যবস্থাপক (নবম গ্রেড) মো. আনসারুল আলম ৪০ হাজার ৩০ টাকা পেয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ওভারটাইমের দৈনিক কোনো কার্যকর রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয় না। ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সিলেট কার্যালয়ের একটি বিশেষ দল অভিযান চালিয়ে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার নামে অনিয়মের তথ্য পাওয়ার পর রেজিস্টার সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, মাসের শেষ দিকে একসঙ্গে ওভারটাইমের হিসাব দাখিল করে অর্থ উত্তোলন করা হয়। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, ওভারটাইমের জন্য আগাম অনুমোদন এবং কাজ শেষে প্রকৃত কর্মঘণ্টার প্রত্যয়ন থাকার কথা।

আরও অভিযোগ রয়েছে, কিছু কর্মকর্তা পরোক্ষভাবে এ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। তাদের অনুমোদনের মাধ্যমে কর্মচারীদের নামে অতিরিক্ত বা ভুয়া ওভারটাইম দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয় এবং এর বিনিময়ে কেউ কেউ সুবিধা পান বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

কোম্পানির নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের পর কর্মচারী পর্যায়ে নিয়মিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য নিয়োগ হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট রয়েছে। কোম্পানিতে প্রায় ৩০০ নৈমিত্তিক শ্রমিকও অস্থায়ীভাবে কাজ করছেন বলে জানা গেছে। তাদের নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে ২০২০ সালে ওভারটাইম অনিয়ম বন্ধে ফিঙ্গারপ্রিন্টভিত্তিক হাজিরা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি বাধাগ্রস্ত হয় বলে অভিযোগ। বর্তমানে নতুন করে হাজিরা ব্যবস্থা চালুর কাজ চললেও কর্মচারীদের এর আওতায় না রাখার অভিযোগ রয়েছে। কর্মচারী ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এমন সিদ্ধান্তে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি।

শ্রম আইন অনুযায়ী কর্মঘণ্টা ও ওভারটাইমের নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সিলেট গ্যাস ফিল্ডসে কোনো কোনো কর্মচারীর নামে মাসে ২০০ ঘণ্টার বেশি ওভারটাইম দেখানো সেই বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কোম্পানির নিজস্ব সার্ভিস রুল ও বিভিন্ন নীতিমালা থাকলেও ওভারটাইম ব্যবস্থাপনা নিয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা না থাকার অভিযোগও রয়েছে। প্রতি বছর নিরীক্ষায় ওভারটাইম খাতে আপত্তি উঠলেও তা যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ।

কর্মচারীদের একাংশের অভিযোগ, দুটি শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণেও ওভারটাইম বণ্টনে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, প্রভাবশালী অংশের কর্মচারীরা ১০০ থেকে ২০০ ঘণ্টা পর্যন্ত ওভারটাইম পেলেও অন্যদের ক্ষেত্রে ৩০-৪০ ঘণ্টা বা কখনো শূন্য ঘণ্টা দেখানো হয়।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিবিএ সভাপতি প্রদীপ কুমার শর্মা। তিনি বলেন, “কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। স্টাফ কম আছে। সে জন্য ওভারটাইম বেশি হয়। যদি নিয়োগ করা যেত, তাহলে এত ওভারটাইম হতো না।”

সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) তারেক আহমদ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং তথ্য কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। বোর্ড চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়েজুল্লাহ বলেন, প্রতিষ্ঠানে জনবল সংকট রয়েছে; তবে বিস্তারিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলতে পারবেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন বলেন, “লোকবল স্বল্পতার কারণেই যারা বিদ্যমান আছে, তাদের দিয়ে কাজ করাতে হচ্ছে।”

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের দাবি, দীর্ঘদিনের জনবল সংকট, ওভারটাইম ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বাধার কারণে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক ও প্রশাসনিক ঝুঁকিতে পড়ছে। তাই ওভারটাইমের হিসাব, হাজিরা, অনুমোদন ও অর্থ পরিশোধের বিষয়গুলো স্বাধীনভাবে তদন্ত করে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।