ঢাকা, বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৯:৫৩:৫৮ PM

নেপালে বন্যায় নিহত ৭২, নিখোঁজ এক হাজার

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
26-08-2026 09:02:18 PM
নেপালে বন্যায় নিহত ৭২, নিখোঁজ এক হাজার

নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ জন হয়েছে। বুধবারের (২৬ আগস্ট) এই বন্যায় হিমালয়কন্যা দেশটির বিভিন্ন জনপদ তলিয়ে গেছে, ব্যাহত হয়েছে যোগাযোগ ও ভ্রমণ ব্যবস্থা। একই সঙ্গে শত শত পর্যটক, শ্রমিক ও অন্যান্য মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ওপারে চীনের গিরং এলাকাতেও বড় ধরনের হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। সেখানে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে চীনা কর্তৃপক্ষ। নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ৩৮৪ জন পর্যটক নিখোঁজ বলে খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ২৯১ জন ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক।

নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের কর্মকর্তাদের ধারণা, নিখোঁজদের বড় একটি অংশ ভারত ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত। তারা হিন্দুদের পবিত্র তীর্থস্থান তিব্বতের কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাচ্ছিলেন। নেপাল পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, বন্যায় অন্তত ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ২৮ জন পুলিশ কর্মকর্তাও রয়েছেন।

বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় নেপালের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দাদের ভোতেকোশি, ত্রিশুলি ও নারায়ণী নদীর তীর থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, বুধবার সকাল প্রায় ৯টার দিকে ভোতেকোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। এতে কয়েকটি গ্রাম, সড়ক ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

নেপাল সরকারের মুখপাত্র সাসমিত পোখারেল বলেন, উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার জন্য ভারত ও চীন—দুই দেশের কাছেই সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। নেপালের খাড়া পাহাড়ি উপত্যকাগুলো দেশটির অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও দুর্যোগের সময় এসব এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নুয়াকোট জেলার বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রবল স্রোত বয়ে যাওয়ার পর ভবনের দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত কাদায় ঢেকে গেছে। গাছের ডাল ও বিদ্যুতের তারে ঝুলে আছে ধ্বংসাবশেষ। অনেক যানবাহন কাদার নিচে চাপা পড়েছে। বেঁচে যাওয়া মানুষদের শরীরজুড়ে কাদা লেগে থাকতে দেখা গেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, বুধবার ভোরে কাঠমান্ডুর প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে এবং চীনের স্বায়ত্তশাসিত তিব্বত অঞ্চলের সীমান্তের কাছে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে।

কাঠমান্ডুর উত্তরাঞ্চলের একটি মহাসড়কের প্রায় সমান্তরালভাবে প্রবাহিত হয়েছে ত্রিশুলি নদী। এই পথ দিয়েই নেপালের জনপ্রিয় ল্যাংটাং ট্রেকিং অঞ্চলে যাতায়াত করা হয়। ফলে বন্যার কারণে ওই অঞ্চলের যোগাযোগ ও পর্যটন কার্যক্রমেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নিখোঁজ নাগরিকদের নিয়ে উদ্বেগ বিভিন্ন দেশের

নেপালে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে কাজ করা দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকজন নাগরিকও নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা।

মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কাঠমান্ডুতে তাদের দূতাবাস কয়েকটি ভ্রমণ সংস্থার কাছ থেকে খবর পেয়েছে যে, রাসুয়া জেলায় অবস্থানরত বলে ধারণা করা ১১ মালয়েশীয় নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। রাসুয়াও বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি।চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বত সীমান্তবর্তী গিরং এলাকায় চীনা কর্তৃপক্ষ ব্যাপক অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উদ্ধার তৎপরতা আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোদি বলেন, নেপালকে সম্ভাব্য সব ধরনের মানবিক সহায়তা দিতে ভারত প্রস্তুত। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট দলগুলো ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছে।

অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড এক যৌথ বিবৃতিতে নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে তারা দুর্গত এলাকার মানুষকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ও সরকারি নিরাপত্তা সতর্কতা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তনশীল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে। 
একই অঞ্চলে গত বছরও হয়েছিল ভয়াবহ বন্যা

গত বছরের আগস্টেও নেপালের একই অঞ্চল আকস্মিক বন্যার কবলে পড়েছিল। তখন তিব্বতের একটি হিমবাহ হ্রদ উচ্চ তাপমাত্রার কারণে উপচে পড়ায় বন্যা দেখা দেয়। ওই ঘটনায় ৯ জন নিহত হন। নেপাল ও চীনের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী একটি সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

কাঠমান্ডুভিত্তিক জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বুধবারের আকস্মিক বন্যার পেছনে হিমবাহ থেকে নেমে আসা বরফ ও পাথরের ধস ভূমিকা রেখেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোতেকোশি নদীর উপনদী লেন্দে খোলায় বুধবার সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা দেখা যায়।

জলবায়ু গবেষণা সংস্থাটির দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সাসওয়াতা সান্যাল বলেন, গত ১৪ মাসে লেন্দে খোলায় দ্বিতীয়বারের মতো বন্যা হয়েছে। এবার নেপালের অংশে একটি হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের ধস নেমে নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। পরে জমে থাকা পানি হঠাৎ নিচের দিকে প্রবল স্রোত হিসেবে নেমে আসে।

উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয় অঞ্চলে আগাম সতর্কব্যবস্থার গুরুত্বও তুলে ধরেছেন তিনি।ভারতসহ কয়েকটি দেশের বিস্তৃত হিমালয় অঞ্চল মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। ফলে ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি এবং হিমবাহ গলে যাওয়াসহ চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা ক্রমেই ঘন ঘন ঘটছে।

চলতি বছরের শুরুতে কাঠমান্ডুর গবেষকেরা জানান, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ দ্রুতগতিতে গলছে। ২০০০ সালের পর থেকে এসব হিমবাহের বরফ ক্ষয়ের হার দ্বিগুণ হয়েছে। গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনই এর প্রধান কারণ।