ঢাকা, সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৬:০৫:৩৫ PM

ঘুরে দাঁড়ানোর পথে দেশ: সরকারের ১৮০ দিন

মান্নান মারুফ
17-08-2026 04:49:32 PM
ঘুরে দাঁড়ানোর পথে দেশ: সরকারের ১৮০ দিন

একটি রাজনৈতিকভাবে অস্থির, অর্থনৈতিকভাবে চাপের মধ্যে থাকা এবং নানা ধরনের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট মোকাবিলা করা রাষ্ট্রকে স্বাভাবিক গতিতে ফিরিয়ে আনা সহজ কাজ নয়। সেই বাস্তবতার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিন পূর্ণ হয়েছে। এই ছয় মাসে সরকারের কর্মকাণ্ড, অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে রাজনৈতিক মহল, বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ফলে ১৭ আগস্ট তাঁর সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এই উপলক্ষে সোমবার প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ের ‘শাপলা’ হলে সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম ও আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে বিশেষ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সভায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহ্‌দী আমিন বলেন, সরকারের গত ছয় মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে ধারাবাহিক উদ্যোগ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের কর্মকাণ্ডে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসকে ধারণ করে সরকার দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—অর্থনীতি ও জনজীবনে কতটা স্বস্তি ফিরেছে। দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যাংকিং খাতের চাপ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এসব সমস্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সংস্কার, বিনিয়োগ বাড়ানো, কর ব্যবস্থার জটিলতা কমানো এবং অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বিষয়টিও সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, আগের সরকারের অপরিকল্পিত কিছু সিদ্ধান্ত বর্তমান সংকট তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে আগামী ১০ বছরে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জাতীয় সংসদে তুলে ধরার কথা জানিয়েছেন তিনি।

কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির কথা সামনে এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ কৃষিঋণ মওকুফের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক কৃষককে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। জেলেদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান এবং নিষেধাজ্ঞার সময় ভিজিএফ সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে। অসচ্ছল, প্রতিবন্ধী ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা অব্যাহত রাখার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক সংস্কারও সরকারের ছয় মাসের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকারের দাবি, রাজনৈতিক হয়রানিমুক্ত পুলিশ ও প্রশাসন গড়ে তোলার পাশাপাশি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য বিচার করতে হলে দীর্ঘমেয়াদে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি, নাগরিক অধিকার, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং আইনশৃঙ্খলার বাস্তব চিত্র পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, মাত্র ছয় মাসে একটি দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত সংকট পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। সরকারের প্রথম ছয় মাসকে তাই অনেকটা ‘ভিত গুছিয়ে নেওয়ার সময়’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই আগামী দিনে সরকারের সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হবে।

অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার জায়গাটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও অর্থনৈতিক চাপের পর মানুষ স্থিতিশীল জীবন, সহনীয় দ্রব্যমূল্য, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন চায়। সরকারের প্রতি জনসমর্থনের কথা বলা হলেও সেই সমর্থন ধরে রাখতে হলে দৃশ্যমান ও টেকসই ফলাফল নিশ্চিত করতে হবে।

সব মিলিয়ে তারেক রহমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিনকে তাৎক্ষণিকভাবে ‘সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি’ বলা যেমন কঠিন, তেমনি এ সময়ের উদ্যোগকে উপেক্ষা করাও যুক্তিসংগত নয়। সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ঘোষিত সংস্কার ও প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়া।

ছয় মাসে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব নয়; কিন্তু একটি সংকটাপন্ন রাষ্ট্রকে স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে নেওয়ার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব। সেই অর্থে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনাপর্ব হিসেবে দেখছেন সমর্থকেরা। আগামী দিনগুলোতেই প্রমাণ হবে, এই সূচনাপর্ব কতটা টেকসই উন্নয়ন ও জনকল্যাণে রূপ নেয়।