ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০১:৩৪:০৩ AM

বিএম মাসুমের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ

ষ্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
24-08-2026 11:55:18 AM
বিএম মাসুমের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ

কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এর রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে অনিয়ম, ঘুষ-বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেট থেকে বদলি হয়ে আসার পর প্রশাসনিক নিয়ম ও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে তদবিরের মাধ্যমে তিনি কমিশনারেটের গুরুত্বপূর্ণ ‘হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তা’ পদে দায়িত্ব নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে তাঁর বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে আদায় এবং সেই অর্থে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় স্ত্রী ও স্বজনদের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কোটি টাকার মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপন (স্মারক নং ০৮.০১.০০০০.০০১১.০৫.০০৪.২০২০-৬৪১, তারিখ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫) অনুযায়ী, বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এ যোগদানের পর বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাইল আটকে রাখা, অডিট প্রক্রিয়া শিথিল করা, শোকজ নোটিশ প্রত্যাহার এবং বন্ড লাইসেন্সসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের নামে অনৈতিক আর্থিক সমঝোতার অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষ করে ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসের কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে প্রতি মাসে ২ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বক্তব্য জানা যায়নি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে থেকে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ ওঠা শুধু ব্যক্তিগত অনিয়মের বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতার প্রশ্নও জড়িত।

স্ত্রীর নামে বিপুল ভূ-সম্পত্তির অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, অনৈতিকভাবে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ দিয়ে বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম তাঁর গৃহিণী স্ত্রী সানজিদা আফরিন লিপির নামে জমি কিনেছেন। স্ত্রীর দৃশ্যমান কোনো আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর ভাটারা মৌজায় তাঁর নামে বিপুল সম্পত্তি নিবন্ধনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

জমিসংক্রান্ত নথিতে ভাটারা মৌজা, জেএল নং ১৫, নামজারি খতিয়ান নং ২৯৭১৬ এবং দাগ নং ২০৭৬৩-এর উল্লেখ রয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৭৫৬(IX-I) নম্বর নামজারি মামলার মাধ্যমে খুলনার সোনাডাঙ্গার স্থায়ী বাসিন্দা সানজিদা আফরিন লিপির নামে এসব সম্পত্তি কেনা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে জমির পরিমাণ নিয়ে সরকারি নথিতে বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। মূল নামজারি খতিয়ানে জমির পরিমাণ ০.৪০০০ একর বা ৪০ শতাংশ উল্লেখ থাকলেও ডিজিটাল ভূমি রেকর্ডে তা ৪.৯৬ একর দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্পদের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন

অভিযোগে বলা হয়েছে, ভাটারা এলাকায় বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতি কাঠা জমির মূল্য প্রায় ৬০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সেই হিসাবে ৪০ শতাংশ বা প্রায় ২৪ কাঠা জমির আনুমানিক মূল্য ১৫ থেকে ৩৬ কোটি টাকা হতে পারে।

অন্যদিকে ডিজিটাল রেকর্ডে দেখানো ৪.৯৬ একর জমি সঠিক হয়ে থাকলে এর বাজারমূল্য কয়েকশ কোটি টাকা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। তবে জমির প্রকৃত মালিকানা, পরিমাণ, ক্রয়মূল্য ও বর্তমান বাজারমূল্য সরকারি নথি যাচাই এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

এ ছাড়া স্ত্রী ও আত্মীয়দের নামে খুলনার সোনাডাঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় আরও সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।

রাজস্ব ও ব্যবসায়ীদের ওপর প্রভাব

কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থা দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের ফাইল আটকে রেখে অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য হলে এর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ওপর নয়, জাতীয় রাজস্ব আদায় ও রপ্তানি খাতের ওপরও পড়তে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন্ড কমিশনারেটের এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তা কমিশনারেটের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন। ফলে এই পদে থেকে সংঘবদ্ধভাবে অনিয়ম হলে তা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির রূপ নিতে পারে।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবসায়ী মহল বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাঁদের দাবি, তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসসংক্রান্ত নথি, তাঁর স্বাক্ষরিত ফাইল নোটিং ও সংশ্লিষ্ট লেনদেন অডিট করার দাবি উঠেছে।

এ ছাড়া বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য গ্রহণ এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত আইনানুগভাবে পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো প্রমাণিত নয়। অভিযোগের প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য গ্রহণ এবং আইনানুগ নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট মহল।