বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পথচলা অব্যাহত রেখেছিল। এই দীর্ঘ সময়ে দলের অসংখ্য নেতাকর্মী কারাবরণ করেছেন, আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছানোর পর এখন দলের অভ্যন্তরে নতুন এক সংকট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীর অভিযোগ, দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের মূল্যায়ন না করে সুবিধাবাদী ও নবাগতদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির বর্তমান সাংগঠনিক বাস্তবতায় ‘ত্যাগী বনাম নবাগতদের’ দ্বন্দ্ব ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। তৃণমূল থেকে শুরু করে মহানগর এবং কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও এই অসন্তোষের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচিগুলোতেও একই অভিযোগ উঠে এসেছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিএনপি রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে থেকে দিবসটি পালন করলেও অনেক ত্যাগী নেতাকর্মী নিজেদের উপেক্ষিত মনে করছেন। তাদের দাবি, যারা দীর্ঘ সময় রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং দলের জন্য ব্যক্তিগত জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের অনেককে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের বাইরে রাখা হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক ছাত্রদল নেতা ও বিএনপির একজন স্থানীয় পর্যায়ের সংগঠক রাকিবুর রহমানের ভাষ্য, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছাত্রদল, ওয়ার্ড বিএনপি এবং থানা পর্যায়ে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং কারাভোগও করেছেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তিনি মনে করেন, দলের ভেতরে এমন অনেক ব্যক্তি প্রভাবশালী অবস্থানে চলে এসেছেন, যারা দলের কঠিন সময়ে দৃশ্যমান ছিলেন না।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কাফরুল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আরশাদ । তার দাবি, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার পরও অনেক ত্যাগী নেতাকে এখন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না। নামমাত্র পদ থাকলেও কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের কর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর রহমানও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে একাধিক মামলার আসামি হয়েছেন এবং দীর্ঘ সময় কারাভোগ করেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গঠিত নতুন সাংগঠনিক কাঠামোয় তিনি এবং তার মতো অনেক পুরোনো কর্মী স্থান পাননি। তার মতে, দলের কঠিন সময়ে যারা সক্রিয় ছিলেন, তাদের মূল্যায়ন না হলে ভবিষ্যতে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হতে পারে।
ঢাকা-১৫ আসনের রাজনীতিতে সক্রিয় একাধিক নেতাকর্মীরও অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করা অনেক নেতা বর্তমানে সাংগঠনিকভাবে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছেন। তাদের মতে, দলের সুসময় আসার সঙ্গে সঙ্গে এমন অনেক ব্যক্তি সামনে চলে এসেছেন, যারা অতীতে দলের কর্মসূচিতে খুব বেশি সক্রিয় ছিলেন না।
সাবেক মহানগর নেতা আহসান উল্লাহ চৌধুরী হাসান মনে করেন, বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে বর্তমানে নতুন ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। তার ভাষায়, আন্দোলনের কঠিন সময়ে যাদের খুঁজে পাওয়া যেত না, আজ তারা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সামনের সারিতে অবস্থান করছেন। এতে দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা যেকোনো বড় রাজনৈতিক দলের জন্য সাংগঠনিক কাঠামো সচল রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আন্দোলন পরিচালনা, মামলা মোকাবিলা, কারাবন্দি নেতাকর্মীদের সহায়তা এবং দলীয় কার্যক্রম পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য অর্থের প্রয়োজন হয়। এই বাস্তবতায় আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা অনেক সময় দলের অভ্যন্তরে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানেই সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর উত্থানের সুযোগ তৈরি হয়। তারা হয়তো সরাসরি রাজপথের আন্দোলনে অংশ নেয় না, কিন্তু অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং বিভিন্ন যোগাযোগের কারণে দ্রুত প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ত্যাগ, অভিজ্ঞতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার চেয়ে অর্থনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব বেশি গুরুত্ব পায়।
দলের ভেতরের একটি অংশের অভিযোগ, কিছু প্রভাবশালী বলয় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পরীক্ষিত ও স্পষ্টভাষী নেতাদের আড়ালে রেখে অনুগত ব্যক্তিদের সামনে নিয়ে আসছে। এর ফলে প্রকৃত কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে এবং সাংগঠনিক ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের মতে, প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় বর্তমানে ত্যাগী এবং নবাগতদের মধ্যে এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। অনেক ক্ষেত্রে এই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য বিরোধে রূপ নিচ্ছে, যা দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ডের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার পর বড় কোনো দলের ভেতরে এমন রূপান্তর অস্বাভাবিক নয়। রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন নেতৃত্ব এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে দলে সম্পৃক্ত করাও প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যদি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে পরিচালিত হয়, তাহলে তা দলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি তার তৃণমূলভিত্তিক সংগঠন এবং দীর্ঘদিনের কর্মীসমর্থকরা। এই কর্মীরাই কঠিন সময়ে দলকে টিকিয়ে রেখেছেন। ফলে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ত্যাগ, দক্ষতা, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং নতুন নেতৃত্বের সমন্বয় ঘটানো জরুরি।
তাদের মতে, প্রকৃত অর্থে ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে দলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং ক্ষোভকে পুঁজি করে কোনো পক্ষের জন্য দলীয় অস্থিরতা তৈরির সুযোগও সীমিত হবে।
রাজনীতির ইতিহাস বলছে, সুসময়ে সুবিধাবাদীদের উপস্থিতি বাড়লেও দুঃসময়ে তারাই সবার আগে সরে যায়। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কর্মীরাই রাজনৈতিক দলের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেন। তাই আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএনপিকে ত্যাগ, অভিজ্ঞতা, মেধা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্ব কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।