কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রতি বছরের মতো এবারও দাম নির্ধারণ করেছিল সরকার। তবে মাঠপর্যায়ে সেই দামের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সরকারি নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি হয়েছে। এতে মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ এবং এতিমখানা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
এ বছর সরকার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করে, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। কিন্তু বাস্তবে বাজারে সেই মূল্য কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
প্রতিবছর কোরবানির ঈদে সবচেয়ে বেশি চামড়া সংগ্রহ করে বিভিন্ন মাদরাসা ও এতিমখানা। অনেক কোরবানিদাতা স্বেচ্ছায় তাদের পশুর চামড়া এসব প্রতিষ্ঠানে দান করেন। বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে পরিচালিত হয় লিল্লাহ বোর্ডিং, এতিমখানা এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও আবাসন ব্যয়ের একটি বড় অংশ। কিন্তু কয়েক বছর ধরেই চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ছে। ফলে চামড়া সংগ্রহে অনেক প্রতিষ্ঠানের আগ্রহও কমে যাচ্ছে।
রাজধানীর মগবাজার, মুগদা, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, সায়েন্স ল্যাব, শেওড়াপাড়া ও লালবাগের পোস্তা এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, ছোট আকারের গরুর কাঁচা চামড়া ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকায়, মাঝারি আকারের চামড়া ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায় এবং বড় আকারের চামড়া ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ সরকারি নির্ধারিত দরে একটি মাঝারি আকারের চামড়ার মূল্য হওয়ার কথা ছিল প্রায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা। একইভাবে বড় আকারের চামড়ার সম্ভাব্য মূল্য ছিল প্রায় ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকার বেশি।
মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার দাম বাড়ালেও ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে সেই দামে চামড়া কেনার কোনো নিশ্চয়তা তারা পাননি। ফলে শুরু থেকেই বাজারে কম দামের প্রভাব পড়েছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ট্যানারি মালিকরা যে দর নির্ধারণ করেন, তার ভিত্তিতেই মাঠপর্যায়ে চামড়া কেনাবেচা হয়। এতে শেষ পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়েন কোরবানিদাতা ব্যক্তি, মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো।
মালিবাগ এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ী জাফর জানান, তিনি ১৫টি গরুর চামড়া বিক্রির জন্য বাজারে নিয়ে যান। প্রতি পিসের দাম ১ হাজার টাকা চাইলেও ব্যবসায়ীরা ৬৫০ টাকার বেশি দিতে রাজি হননি। পরে দাম কমিয়ে ৮০০ টাকা করলেও ক্রেতা পাননি।
জাফর বলেন, “গত বছর একই ধরনের চামড়া ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এবার সবাই ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকার বেশি দিতে চাইছে না। সরকার দাম বাড়ালেও বাজারে তার কোনো প্রভাব নেই।”
রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। মোহাম্মদপুরের শেরশাহ সুরি রোডের মৌসুমি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ স্বপন জানান, তিনি ছোট চামড়া ৪৫০ টাকায়, মাঝারি চামড়া ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায় এবং বড় চামড়া ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায় কিনেছেন।
তার ভাষায়, “আমরা ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে যে দাম পাচ্ছি, সে অনুযায়ী কিনছি। বেশি দামে কিনলে লোকসান গুনতে হবে।”
সায়েন্স ল্যাব এলাকার ব্যবসায়ী আবিদ হোসেন হানিফও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় বাজারে চামড়ার দাম কমেছে। তবে ট্যানারিতে কম দামে বিক্রি করতে হওয়ায় তাদের কিছু করার নেই।
গরুর চামড়ার পাশাপাশি ছাগলের চামড়ার বাজারেও ধস নেমেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতি পিস ছাগলের চামড়া মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো মূল্য ছাড়াই চামড়া নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ধানমন্ডির এক ব্যবসায়ী জানান, সংরক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ছাগলের চামড়া এখন অনেকের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চামড়ার বাজারের এই অস্থিরতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশের মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ব্যয়ের একটি বড় অংশ আসে কোরবানির চামড়া বিক্রির আয় থেকে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান চামড়া সংগ্রহকে আগের মতো গুরুত্ব দিচ্ছে না।
মিরপুরের আরজাবাদ মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া বলেন, “সরকার যে দাম নির্ধারণ করে, তা বাস্তবে কার্যকর হয় না। আমরা চামড়ার ন্যায্যমূল্য পাই না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ হারাচ্ছে।”
খিলগাঁওয়ের নাজমুল হক মদিনাতুল উলুম কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাহবুবুল্লাহ বলেন, “চামড়া দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। অথচ প্রতি বছর পরিকল্পিতভাবে এই খাতকে দুর্বল করা হচ্ছে। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
তবে দাম কমার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ট্যানারি মালিকরা। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ দাবি করেন, গত বছরের তুলনায় চামড়ার দাম কমেনি; বরং ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে।
তিনি বলেন, “আমি নিজেই ৬৫০ থেকে ৯৫০ টাকা পর্যন্ত দামে চামড়া কিনেছি। বাজার পুরোপুরি সক্রিয় হতে কিছুটা সময় লাগে। বিকেল ও সন্ধ্যার দিকে দাম আরও বাড়তে পারে।”
তার দাবি, রাজধানীর কাঁচা চামড়ার বাজার স্থিতিশীল রাখতে অনেক ট্যানারি এবার সরাসরি মাঠপর্যায়ে চামড়া সংগ্রহ করছে। তবে দিনের শুরুতে কেনাবেচা কম হওয়ায় কোথাও কোথাও কম দামে বিক্রি হয়ে থাকতে পারে।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন বলেই মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। পোস্তা এলাকায় সন্ধ্যার পর বাজার কিছুটা জমলেও দামে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। সেখানে বড় আকারের চামড়া ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায়, মাঝারি চামড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় এবং ছোট চামড়া ১৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল প্রায় ১ কোটি ১ লাখ। এর বিপরীতে প্রস্তুত ছিল প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৪ হাজার পশু।
তবে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এবার কোরবানির সংখ্যা কিছুটা কম হতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই ট্যানারি মালিকরা ৭৫ থেকে ৮০ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, যা গত বছরের তুলনায় কম।
চামড়া ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের অস্বচ্ছতা বিরাজ করছে। সরকার মূল্য নির্ধারণ করলেও তা বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। মাঠপর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ট্যানারি ও বড় আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তারা বাধ্য হয়েই কম দামে চামড়া কেনাবেচা করছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করতে লবণ, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয়সহ গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা খরচ হয়। সে হিসাবে সরকারি নির্ধারিত দামের তুলনায় বাস্তব বাজারমূল্য অর্ধেকেরও কম।
তাদের অভিযোগ, প্রতি বছর ঈদের আগে সরকার দাম ঘোষণা করলেও বাজার তদারকিতে কার্যকর ভূমিকা দেখা যায় না। ফলে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিকের সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো চামড়া খাতের ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে শুধু দাম ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; বরং বাজার তদারকি, সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নয়ন, ট্যানারি খাতে স্বচ্ছতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই শিল্পখাত আরও সংকটে পড়বে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মাদরাসা, এতিমখানা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।