বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম একটি অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ নাম। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্র পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কৃষি বিপ্লব, জাতীয়তাবাদী দর্শনের বিকাশ এবং বহুমাত্রিক রাজনৈতিক চিন্তার মাধ্যমে তিনি একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠা করেন। তার রাজনৈতিক বক্তব্য, কর্মসূচি এবং স্লোগানগুলো শুধু একটি দলের পরিচয় বহন করে না; বরং দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান প্রতীক হলো ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান। দীর্ঘদিন ধরে এটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই স্লোগান শুধু একটি রাজনৈতিক উচ্চারণ নয়; বরং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার যে দর্শন তিনি লালন করতেন, তারই প্রতিফলন দেখা যায় এই স্লোগানে।
একইভাবে ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ’ স্লোগানটিও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি মূলত দেশের প্রতি সর্বোচ্চ অঙ্গীকার, দায়িত্ববোধ এবং ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিএনপির নেতাকর্মীরা এই স্লোগানের মাধ্যমে দেশ ও জনগণের প্রতি নিজেদের অটুট অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন। সময়ের পরিক্রমায় এই স্লোগান রাজনৈতিক পরিসরের বাইরেও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে, ‘শহীদ জিয়া অমর হোক’ স্লোগানটি তার রাজনৈতিক আদর্শ, নেতৃত্ব এবং অবদানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বহিঃপ্রকাশ। বিএনপি এবং তার সমর্থকরা বিভিন্ন কর্মসূচি ও সমাবেশে এই স্লোগান উচ্চারণের মাধ্যমে শহীদ রাষ্ট্রপতির প্রতি তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকেন।
জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন দর্শনের অন্যতম পরিচায়ক ছিল ‘খাল কাটুন—ফসল ফলান’ কর্মসূচি। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোরের শার্শা উপজেলার উলশী থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত খাল খনন কার্যক্রম উদ্বোধনের মাধ্যমে তিনি এই স্লোগানকে জাতীয় উন্নয়ন কর্মসূচির অংশে পরিণত করেন। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন এবং জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা। ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’ গড়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, খাল খনন কর্মসূচি ছিল সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রায় পাঁচ দশক পরও দেশের কৃষি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে এ কর্মসূচির গুরুত্ব অটুট রয়েছে।
জিয়াউর রহমান শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন নিয়েই ভাবেননি; আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তিনি একটি স্বতন্ত্র দর্শন তুলে ধরেছিলেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘সহায়তা নয়—চাই বাণিজ্য’। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতার পরিবর্তে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও উৎপাদনমুখী উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
জনগণের প্রতি তার আস্থা ছিল অসীম। তিনি বিশ্বাস করতেন, জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। তাই তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, ‘জনগণই যদি রাজনৈতিক দল হয়, তাহলে আমি সেই দলেই আছি।’ এই বক্তব্যে জনগণের ক্ষমতায়ন, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি তার অঙ্গীকার সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান ছিলেন সুদূরপ্রসারী চিন্তার অধিকারী। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং আবাসনের মতো মৌলিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি তিনি শিশু, কিশোর, যুবক, যুবতী ও প্রবীণ নাগরিকদের উন্নয়ন নিয়েও পরিকল্পনা করেছিলেন। তার শাসনামলে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হয়, যা পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় নীতিমালার অংশে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসেও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালালে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তার স্বাধীনতার ঘোষণার বার্তা মুক্তিকামী বাঙালিদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল।
স্বাধীনতার ঘোষণায় তিনি যে রাষ্ট্রচিন্তার কথা তুলে ধরেছিলেন, সেখানে নিরপেক্ষতা, শান্তি এবং সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার নীতির কথা উল্লেখ ছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়চেতা। তার বিখ্যাত উক্তি—‘বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, কিন্তু কোনো প্রভু নেই’—বাংলাদেশের স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রতীক হিসেবে আজও আলোচিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
দেশপ্রেমের প্রশ্নে তার অবস্থান ছিল আপসহীন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি অনেক ত্যাগে, অনেক রক্ত দিয়ে; কিন্তু স্বাধীনতা শুধু পতাকা বা মানচিত্রের বিষয় নয়।’ এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হিসেবে অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জনগণের কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
তার রাজনৈতিক দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল মহান স্রষ্টার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস। তিনি ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’কে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এ বিষয়টি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিফলিত হয়। তার মতে, নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্মীয় ও মানবিক চেতনার সমন্বয় প্রয়োজন।
জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই ধারণার মূল বক্তব্য হলো—বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সকল জাতি, ধর্ম, ভাষা ও গোষ্ঠীর মানুষের সম্মিলিত পরিচয় হলো ‘বাংলাদেশি’। এখানে ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জিয়াউর রহমানের বক্তব্য ও স্লোগানগুলোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এগুলোর সংক্ষিপ্ততা এবং গভীর তাৎপর্য। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা বদলালেও তার অনেক বক্তব্য আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করা হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমান শুধু একজন রাষ্ট্রপতি বা রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি একটি দর্শনের নাম। তার উন্নয়ন ভাবনা, জাতীয়তাবাদী চেতনা, কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি, পররাষ্ট্রনীতি এবং জনগণকেন্দ্রিক রাজনীতির ধারণা এখনও বিভিন্ন মহলে আলোচনার বিষয়। তার রেখে যাওয়া রাজনৈতিক বার্তা ও কর্মসূচিগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা ও জাতীয় উন্নয়নের আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে প্রাসঙ্গিক থাকবে বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
লেখক পরিচিতি: শায়রুল কবির খান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী।