ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬,
সময়: ১০:২৮:৩৩ PM

তরুণ নেতৃত্বের প্রতীক নাহিদ ইসলাম

মান্নান মারুফ
29-05-2026 02:55:05 PM
তরুণ নেতৃত্বের প্রতীক নাহিদ ইসলাম

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় তরুণ নেতৃত্বের আলোচিত নাম নাহিদ ইসলাম। শান্ত স্বভাব, ভদ্র আচরণ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সংগ্রামী রাজনৈতিক চেতনার কারণে তিনি অল্প সময়েই দেশের তরুণ সমাজের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। অহংকারহীন ব্যক্তিত্বের এই তরুণ রাজনীতিক সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমকে সামনে রেখে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ধারা দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ছাত্রজীবন থেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময় থেকেই তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ২০১৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকাকালে সুন্দরবনের নিকটে রামপাল তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেন। এরপর ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

ছাত্র রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে তিনি ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করেন। ছাত্রদের অধিকার ও দাবি-দাওয়া নিয়ে সোচ্চার থাকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে তিনি দ্রুত পরিচিত মুখে পরিণত হন। পরে ২০২৩ সালে আখতার হোসেনসহ সহপাঠীদের নিয়ে “গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তি” নামে একটি ছাত্র সংগঠন গঠন করেন এবং সংগঠনটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি নুরুল হক নূরের প্রতিষ্ঠিত “বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ”-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

নাহিদ ইসলাম মূলত জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসেন ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন তিনি। আন্দোলন ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং এক পর্যায়ে তা অসহযোগ আন্দোলনে পরিণত হয়। আন্দোলনের নেতৃত্বে নাহিদ ইসলামের দৃঢ়তা ও সাংগঠনিক দক্ষতা তাকে তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলে।

আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠার পর ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তাকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। অভিযোগ ওঠে, সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা তাকে রাজধানীর সবুজবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে আহত ও অচেতন অবস্থায় তাকে পূর্বাচলের একটি সেতুর নিচে পাওয়া যায়। পরবর্তীতে আবারও তাকে ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে আটক করা হয়।

ডিবি হেফাজতে থাকা অবস্থায় আন্দোলন স্থগিতের আহ্বান জানিয়ে যে বিবৃতি প্রচার করা হয়েছিল, পরে নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, তাকে জোরপূর্বক সেই বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই ঘটনার পর তার প্রতি জনসমর্থন আরও বৃদ্ধি পায় এবং তিনি তরুণদের কাছে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন।

শেখ হাসিনার সরকারের পতনের দাবিতে আন্দোলন যখন তীব্রতর হয়, তখন নাহিদ ইসলাম শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পর তিনি বলেন, শুধু সরকার পরিবর্তনই নয়, বরং “ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার স্থায়ী অবসান” নিশ্চিত করাই হবে তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক লক্ষ্য।

এরপর শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের দাবিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন। পরে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। একই সঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন।

সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় নাহিদ ইসলাম তরুণবান্ধব প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন গঠনের কথা বলেন। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গণমুখী প্রশাসনিক সংস্কারের পক্ষে তিনি ধারাবাহিকভাবে বক্তব্য দিয়ে আসেন।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং নতুন রাজনৈতিক দল “জাতীয় নাগরিক পার্টি” (এনসিপি)-তে যোগ দেন। পরবর্তীতে তাকে দলটির আহ্বায়ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এনসিপির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ভারতপন্থী কিংবা পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির কোনো স্থান নেই; বরং দেশের জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের অধিকারকে প্রাধান্য দিয়েই রাজনীতি পরিচালিত হবে।

তিনি “দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র” প্রতিষ্ঠা এবং একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের অঙ্গীকার করেন। তার বক্তব্যে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, গণতন্ত্র পুনর্গঠন এবং জনগণের অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নাহিদ ইসলামের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো তার ব্যক্তিগত সততা, সংযত আচরণ এবং পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক ভাবমূর্তি। তিনি সংঘাতের পরিবর্তে রাজনৈতিক সংলাপ ও গণতান্ত্রিক চর্চাকে গুরুত্ব দেন। তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ মনে করে, প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে নতুনধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি করেছেন তিনি।

২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়। অল্প বয়সেই ছাত্র আন্দোলনের নেতা থেকে জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিবিদ হিসেবে তার উত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে নাহিদ ইসলামকে ঘিরে দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, সততা, দায়িত্ববোধ এবং গণমানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ধরে রাখতে পারলে তিনি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।