কওমি ধারার সাতটি ইসলামী রাজনৈতিক দল ভবিষ্যতে একসঙ্গে চলার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর উদ্যোগে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত নতুন একটি রাজনৈতিক জোটে রূপ নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
হেফাজতের আমির চান কওমি ঘরানার দলগুলো এক ছাতার নিচে এসে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজনীতি করুক এবং ধর্মীয় ও জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে সমন্বিতভাবে ভূমিকা রাখুক। এ লক্ষ্যে তিনি বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রতিটি দলের কাছে লিখিত প্রস্তাব চেয়েছেন। ঐক্যের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোতে পারে, সে বিষয়ে মতামতও আহ্বান করেছেন। এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে আগামী আগস্টের শুরুতে আবার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে সম্ভাব্য ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত হতে পারে। একই সঙ্গে নেতৃত্বের কাঠামো নিয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ঐতিহ্যবাহী বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের আমিরের সভাপতিত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট এবং নেজামে ইসলাম পার্টির তিনজন করে প্রতিনিধি অংশ নেন। হেফাজতের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন অন্তত ২০ জন জ্যেষ্ঠ নেতা।
সভা শেষে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান বলেন, সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাতটি দল একসঙ্গে থাকবে। তবে এই ঐক্যের কাঠামো বা ফর্মুলা কী হবে, তা শিগগিরই নির্ধারণ করা হবে।
ভাঙছে কি জামায়াতের জোট?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসলামী দলগুলোর একটি অংশ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। সাতটি দলের মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন শুরুতে ওই সমঝোতার অংশ থাকলেও পরে নির্বাচনের আগে আটটি আসনে এককভাবে নির্বাচন করে। একইভাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও শুরুতে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনা চালালেও শেষ পর্যন্ত ২৫৯টি আসনে একক প্রার্থী দেয়।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসলামী দলগুলোর বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে জোট বা আসন সমঝোতার কারণে কয়েকটি দলের সঙ্গে হেফাজতের শীর্ষ আলেমদের একাংশের দূরত্ব তৈরি হয়। পাশাপাশি দলগুলোর নেতাদের মধ্যেও মতপার্থক্য বাড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন সভা-সেমিনারে একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনাও দেখা যায়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সেই দূরত্ব কমিয়ে ইসলামের স্বার্থে সমন্বিত কর্মসূচি পালনের লক্ষ্যেই হেফাজতের আমিরের উদ্যোগে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
হেফাজতের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে থাকা কওমি ঘরানার দলগুলোকে ঐ জোটের বাইরে এনে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা। তবে বর্তমানে যারা ১১ দলীয় জোটে রয়েছে, তারা এখনই জোট ছাড়বে কি না—এ বিষয়ে বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত আলোচনা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ভবিষ্যতে সাতটি ইসলামী দল আনুষ্ঠানিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হলে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়বে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে দলটির মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ এশিয়া পোস্টকে বলেন,
“রাজনৈতিকভাবে আমরা একটি প্ল্যাটফর্মে আছি। জোট ছেড়ে দিয়ে সাত দল মিলে নতুন জোট হবে—এ ধরনের কোনো আলোচনা ওই বৈঠকে হয়নি। আমরা জামায়াতের জোটে থাকব কি না, সে বিষয়ে দলীয়ভাবে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত জানাব। জামায়াতের জোটে থেকেও সাত দলের সঙ্গে নীতিগত বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।”
সম্ভাব্য জোটের নেতৃত্বে কারা?
হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর উদ্যোগে ঐক্যের প্রক্রিয়া শুরু হলেও সম্ভাব্য রাজনৈতিক জোটের নেতৃত্বে তিনি থাকবেন না বলে জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী।
এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন,
“প্রতিটি দলেরই নিজস্ব মতামত রয়েছে। তারা কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও ঐক্যের চেষ্টা করবেন। সাতটি দলের নেতৃত্বে কারা থাকবেন, এখনই বলা যাচ্ছে না। এটি আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। তবে হেফাজতের আমির রাজনৈতিক জোটের নেতৃত্বে থাকবেন না। রাজনৈতিক দলের নেতারাই নেতৃত্ব দেবেন। তিনি তাদের দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দেবেন।”
অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ বলেন,
“ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সেই দূরত্ব কমানোর জন্যই হেফাজতের আমিরের নেতৃত্বে বৈঠক হয়েছে। এখানে নতুন জোট গঠন হবে কি না, কিংবা নেতৃত্বে কারা থাকবেন—এতদূর পর্যন্ত আলোচনা এগোয়নি।”