ঢাকা, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৪:৪২:১০ AM

ব্রুনাই ফেরত শ্রমিক: বেদনা ও বিচার

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
21-07-2026 08:49:43 PM
ব্রুনাই ফেরত শ্রমিক: বেদনা ও বিচার

ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগকে ঘিরে প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা, আবেদন অনুমোদনে বৈষম্য এবং একটি নির্দিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানের প্রথম দুই পর্বে বিভিন্ন নথি, অভিযোগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অসংগতি তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম পর্বে শ্রমবাজারের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট এবং অভিযোগের উৎস উপস্থাপন করা হয়। দ্বিতীয় পর্বে একই নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের দুটি পৃথক ডিমান্ড লেটার, শ্রমিকের সংখ্যা ২৩০ থেকে ৩০০-এ বৃদ্ধি, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আবেদন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করা হয়।

তবে এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এর মানবিক প্রভাবও গভীর। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় যাওয়া অনেক বাংলাদেশির জীবন, পরিবার, সঞ্চয় এবং ভবিষ্যৎ এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু একজন আবেদনকারী বা একটি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠান নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হন শ্রমিক, তাঁর পরিবার এবং দেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থাও।

সাজরুল দম্পতির অভিযোগ

অভিযোগকারী সাজরুল ও তাঁর পরিবারের দাবি, ব্রুনাইয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশ হাইকমিশনার নওরিন আহসানের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রীকে হাইকমিশনারের বাসভবনে গৃহপরিচারিকার কাজে নিয়োগের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই পরিবারটি উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।

বিদেশে যাওয়ার ব্যয় বহনের জন্য রাজশাহীতে তাঁদের পারিবারিক কৃষিজমির একটি অংশ বিক্রি করা হয়। পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকেও অর্থ সংগ্রহ করা হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিদেশে একটি স্থায়ী আয়ের প্রত্যাশাই তাঁদের এমন আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

তাঁদের দাবি, ব্রুনাই পৌঁছানোর পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। সাজরুলের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর স্ত্রী বাসার কাজে যোগ দিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। কর্মপরিবেশ জটিল হয়ে ওঠে এবং মানসিক চাপ বাড়তে থাকে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাজরুল প্রায় এক মাস ২১ দিন এবং তাঁর স্ত্রী মাত্র ২৫ দিন ব্রুনাইয়ে অবস্থানের পর দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন।

এই অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনার নওরিন আহসান বা বাংলাদেশ হাইকমিশনের কোনো লিখিত বক্তব্য এই প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

দেশে ফেরার পর সংকট

অভিযোগকারী পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে ফিরে তাঁদের আর্থিক সংকট আরও তীব্র হয়। বিদেশে যাওয়ার জন্য বিক্রি করা জমি আর ফিরে পাওয়া সম্ভব হয়নি। নতুন করে কোনো ব্যবসা শুরু করার মতো পুঁজিও ছিল না। ঋণের কিস্তি, সংসারের ব্যয় এবং সামাজিক চাপ একসঙ্গে বাড়তে থাকে।

পরিবারের দাবি, এই আর্থিক ও মানসিক চাপের মধ্যেই পরিবারের এক সদস্য স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। বর্তমানে পরিবারটি অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছে। অভিযোগকারীদের মতে, বিদেশযাত্রা তাঁদের কাছে ছিল জীবন বদলে দেওয়ার স্বপ্ন; কিন্তু সেই স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

মারিয়ার অভিযোগ

অভিযোগকারীদের দেওয়া আরেকটি ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মারিয়া নামে এক বাংলাদেশি নারী।

অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁকে ব্রুনাইয়ে একটি ব্যক্তিগত বাসভবনে রান্নার কাজের জন্য নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর কাজ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয় এবং তাঁকে বাসা ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কাজ ও আবাসন একসঙ্গে হারিয়ে তিনি বিদেশের মাটিতে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। পরে জীবিকার তাগিদে বাংলাদেশি মালিকানাধীন একটি রেস্তোরাঁয় কয়েক মাস কাজ করার পর দেশে ফিরে আসেন।

এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের কোনো লিখিত প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

ব্যর্থ অভিবাসনের মূল্য

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া একজন শ্রমিকের চাকরি হারানো কেবল কর্মসংস্থান হারানোর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জমি বিক্রি, ঋণের বোঝা, সন্তানের শিক্ষা, পারিবারিক ভবিষ্যৎ, সামাজিক মর্যাদা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বাংলাদেশের মতো রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতিতে একজন শ্রমিকের বিদেশযাত্রা একটি পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ। ফলে বিদেশে গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে কর্মহীন হয়ে দেশে ফিরতে হলে অনেক পরিবার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার শ্রমিক নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, বিপুল ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়া অনেক শ্রমিক দীর্ঘ সময় কাজ না পেয়ে ঋণের বোঝা নিয়েই দেশে ফিরে আসেন।

এই প্রতিবেদনের সঙ্গে ব্রুনাই-সংক্রান্ত অভিযোগগুলোর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন দাবি করা হচ্ছে না। তবে অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত জনবল চাহিদা যাচাই, নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে যেকোনো শ্রমবাজারেই একই ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে।

যেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি

এই অনুসন্ধানে উত্থাপিত নথি, অভিযোগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে—

প্রথম আবেদন কেন অনুমোদন পায়নি?
দ্বিতীয় আবেদন কোন প্রশাসনিক ভিত্তিতে অনুমোদিত হয়েছিল?
প্রকল্পের প্রকৃত জনবল চাহিদা যাচাই করা হয়েছিল কি?
কোনো সাইট ভিজিট বা মূল্যায়ন প্রতিবেদন রয়েছে কি?
আবেদন অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান লিখিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না?

অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বিষয়ে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া হয়েছে।

জবাবের অপেক্ষা

এই ধারাবাহিক অনুসন্ধানে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনার নওরিন আহসান এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের লিখিত বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। এই প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত কোনো লিখিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ করে, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে এবং লাখো পরিবারের জীবিকা নির্বাহে ভূমিকা রাখে।

সে কারণে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রতিটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং তথ্যভিত্তিক হওয়া জরুরি। অভিযোগগুলো সত্য হলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। অন্যদিকে অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হলে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের সুনাম পুনঃপ্রতিষ্ঠাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রুনাইকে ঘিরে ওঠা এই বিতর্ক এখন আর শুধু একটি আবেদন অনুমোদনের প্রশ্ন নয়; এটি প্রবাসী শ্রমিকের অধিকার, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, জনআস্থা এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সুনামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই সব পক্ষের বক্তব্য, নথি এবং প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তই পারে এই বিতর্কের গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য সমাধান নিশ্চিত করতে।