ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০২:৫৫:৪০ AM

গ্যাস বিলে ৯৮২ কোটি আত্মসাৎ,প্রমান দুদকে

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
03-08-2026 04:04:46 PM
গ্যাস বিলে ৯৮২ কোটি আত্মসাৎ,প্রমান দুদকে

ইউনাইটেড গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্যাসের মূল্য পরিশোধে অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ৯৮২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড ক্যাপাসিটি রেটের পরিবর্তে বেআইনিভাবে আইপিপি (ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) রেটের সুবিধা গ্রহণ করে দীর্ঘ সময় ধরে প্রকৃত প্রাপ্য গ্যাস বিলের চেয়ে কম অর্থ পরিশোধ করেছে। সম্প্রতি আদালতে দাখিল করা দুদকের অনুসন্ধান অগ্রগতি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি পর্যালোচনা করে বিষয়টি জানা গেছে।

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিষয়টি কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; বরং ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈন উদ্দিন হাসান রশিদ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ একযোগে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সরকারি অর্পিত সম্পত্তি জাল দলিলের মাধ্যমে দখল, অবৈধ সম্পদ অর্জন, বিদেশে অর্থ পাচার এবং গ্যাস বিল পরিশোধে অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নথি বিশ্লেষণের পর দুদক অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জানুয়ারি ২০১৮ থেকে মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কাছে ইউনাইটেড পাওয়ারের বকেয়া গ্যাস বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৮৬ কোটি ৪৩ লাখ ৮২ হাজার ৬১১ টাকা ৭৫ পয়সা। একইভাবে অক্টোবর ২০১৮ থেকে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কাছে বকেয়া রয়েছে ৪৯৫ কোটি ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৪০৪ টাকা। ফলে দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৮১ কোটি ৬৭ লাখ ৮০ হাজার ১৫ টাকা ৭৫ পয়সা, যা প্রায় ৯৮২ কোটি টাকার সমান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি রেট অনুযায়ী গ্যাস বিল পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি আইপিপি রেটের সুবিধা গ্রহণ করে দীর্ঘদিন ধরে কম হারে বিল পরিশোধ করেছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে দুদক প্রাথমিকভাবে মনে করছে।

দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র বিশ্লেষণে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে অনুসন্ধান এখনও চলমান। বাকি অনুসন্ধান কার্যক্রম শেষ করে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করা হবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কমিশন প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে একই অভিযোগের অনুসন্ধানের স্বার্থে চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি আদালত ইউনাইটেড গ্রুপ ও নেপচুন হাউজিং লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ রাজা, ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈন উদ্দিন হাসান রশিদ এবং নেপচুন হাউজিং লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই আদেশ দেন, যাতে অনুসন্ধান কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়।

পরবর্তীতে মঈন উদ্দিন হাসান রশিদ বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। ওই আবেদনের শুনানিকালে আদালত দুদককে অনুসন্ধানের সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। আদালতের সেই নির্দেশ অনুসারে দাখিল করা প্রতিবেদনে গ্যাস বিল সংক্রান্ত অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

দুদক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনুসন্ধানের পরিধি এখনও শেষ হয়নি। গ্যাস বিলে অনিয়মের পাশাপাশি অর্থ পাচার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সরকারি অর্পিত সম্পত্তি দখলের অভিযোগগুলোর আর্থিক লেনদেন, সম্পদের উৎস, মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে আরও বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ করা হবে।

দুদকের কর্মকর্তাদের ধারণা, অনুসন্ধান সম্পন্ন হওয়ার পর অনিয়মের আর্থিক পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রায় ৯৮২ কোটি টাকার গ্যাস বিল বকেয়া ও অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলেও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে রাষ্ট্রের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ আরও স্পষ্ট হবে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন এবং প্রচলিত অন্যান্য আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।