যশোর সদর উপজেলার কোতোয়ালি থানাধীন বসুন্দিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুষ, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং বিভিন্ন অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ভুক্তভোগীদের দাবি, নামজারি (নামপত্তন), জমাখারিজসহ বিভিন্ন ভূমি-সংক্রান্ত সেবা পেতে নির্ধারিত অঙ্কের ঘুষ দিতে বাধ্য করা হয়। ঘুষ না দিলে আবেদনপত্র দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা বা ফাইল গায়েব হয়ে যাওয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা পলাশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বসুন্দিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাধারণ মানুষ জমি-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের জন্য প্রতিদিন ভূমি অফিসে আসেন। অভিযোগ রয়েছে, অফিসে সক্রিয় একটি দালালচক্র আবেদনকারীদের সঙ্গে ঘুষের দর-কষাকষি করে। পরে নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে ফাইল পৌঁছে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ঘুষের টাকা পরিশোধের পরই কেবল সংশ্লিষ্ট কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়।
তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা যায়, বসুন্দিয়া মডেল দাখিল মাদ্রাসার নামে ৭৫ শতাংশ জমির নামজারি করতে ৪০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক শহিদুল ইসলাম ওই অর্থ ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা পলাশের হাতে পৌঁছে দেন। অর্থ পাওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই নামজারি সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে একই সঙ্গে অভিযোগে বলা হয়েছে, মাদ্রাসার সভাপতি লুৎফর রহমান এর আগে ওই জমির ৫৪ শতাংশ বিক্রি করে দেন। এর মধ্যে ২৭ শতাংশ জমি স্ত্রী জামেলা বেগমের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। পরে ২০১৫ সালে জামেলা বেগম সেই জমি ছেলে সাকিবুর রহমানের নামে দানপত্র করেন এবং সাকিবুর নিজের নামে নামজারি সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে অবস্থান করছেন। অবশিষ্ট ২১ শতাংশ জমি ইসমাইল বিশ্বাস ওরফে বাটুল বিশ্বাসের কাছে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বর্তমানে মাদ্রাসার নামে মাত্র ২৪ শতাংশ জমি অবশিষ্ট রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি অফিসকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী দালালচক্র গড়ে উঠেছে। তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন সেবার জন্য অর্থ লেনদেন হয়। অভিযোগে রতন, আতিয়ারসহ কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে, যারা বিভিন্ন ভূমি-সংক্রান্ত কাজ ও সরকারি জমি লিজের প্রতিবেদন সংগ্রহে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া ভুয়া খাজনা দাখিলা ও নামজারির মাধ্যমে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, অফিসের এক পিয়নের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন করা হয়। একই সঙ্গে ওই পিয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও নানা অভিযোগ স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কয়েক বছর আগেও অভিযুক্ত কর্মকর্তার জীবনযাত্রা ছিল সাধারণ। বর্তমানে তার জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে এবং গ্রামে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ চলছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। তবে এসব সম্পদের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এছাড়া অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেছেন। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা পলাশ সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমি কোনো ঘুষ গ্রহণ করি না। অনেক সময় মানুষ স্বেচ্ছায় সৌজন্যবশত উপহার বা হাদিয়া দিতে চায়। আমার অফিসে ঘুষের কোনো কারবার হয় না।”
তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যার কথা বলা হচ্ছে, তাকে ইতোমধ্যে এই অফিস থেকে বদলি করা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে একটি কুচক্রী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি সবসময় নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন করেছি।”
এ বিষয়ে যশোর সদর ভূমি কর্মকর্তা জাকির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি বিষয়টি আপনার কাছ থেকেই শুনলাম। অভিযোগটি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে ভুক্তভোগীদের একটি অংশ অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সাধারণ মানুষের দাবি, বসুন্দিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ওঠা ঘুষ, দালালচক্র ও অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা উদ্ঘাটন করা হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ভূমি সেবা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।