ঢাকা, সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৫:২০:৪৫ PM

বখতিয়ারের মৃত্যু: ৫১ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
17-08-2026 12:10:10 PM
বখতিয়ারের মৃত্যু: ৫১ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ

কক্সবাজারের উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের ইউপি সদস্য বখতিয়ার আহমেদকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া, পরে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার ঘটনা এবং তার পরিবারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা ও মূল্যবান কাগজপত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নিহতের পরিবারের সদস্যরা তৎকালীন টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও উখিয়া থানার ওসি মর্জিনা আক্তারের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন। তবে অভিযোগগুলোর সবকটি আদালত বা তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

পরিবারের দাবি, ২০২০ সালের ২৩ জুলাই ভোরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য বখতিয়ার মেম্বারের উখিয়ার কুতুপালং এলাকার বাসায় অভিযান চালান। অভিযানে নেতৃত্বে ছিলেন ওসি প্রদীপ ও ওসি মর্জিনা। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ একজন আসামিকে শনাক্ত করার কথা বলে বখতিয়ারকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে উখিয়া ও টেকনাফ থানায় যোগাযোগ করেও তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঘটনাটির সময় ২২ জুলাই গভীর রাত থেকে ২৩ জুলাই ভোর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বখতিয়ারের স্ত্রী শাহীন আক্তারের অভিযোগ, একই দিন সন্ধ্যার দিকে প্রদীপ ও মর্জিনার নেতৃত্বে আবারও একটি বড় পুলিশ দল তাদের বাড়িতে যায়। তখন আলমারিতে ১৮ লাখ টাকা রয়েছে—এমন দাবি করে পুলিশ টাকা বের করে দিতে বলে। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, টাকা দেওয়ার পরও ঘরের আলমারি, লকার ও অন্যান্য স্থানে তল্লাশি চালানো হয় এবং ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। একপর্যায়ে নগদ ৫১ লাখ টাকার বেশি অর্থ, জমির দলিলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে যাওয়া হয় বলে পরিবারের দাবি। তাদের আরও অভিযোগ, মামলার জব্দ তালিকায় মাত্র ১০ লাখ টাকা দেখানো হলেও বাকি অর্থ ও দলিলের কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি।

বখতিয়ারের পুত্রবধূ রোমানা শারমিন অভিযোগ করেন, অভিযানের সময় পরিবারের নারী সদস্যদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়। তিনি দাবি করেন, ওসি প্রদীপের কাছে নারী পুলিশ সদস্য ছাড়া পুরুষ সদস্যদের দিয়ে তার শাশুড়িকে হয়রানি করার প্রতিবাদ করায় তাকে চড় মারা হয়। রোমানার ভাষ্য, ওসি প্রদীপ ও মর্জিনা দুজনই টাকা নেওয়ার ঘটনায় জড়িত ছিলেন। অপরদিকে তৎকালীন উখিয়া থানার ওসি মর্জিনা আক্তার গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন কারণ সেটি তার থানার এলাকা। তিনি টাকা নেওয়ার বিষয়টি দেখেছেন, তবে নিজে টাকা নেননি বলে দাবি করেন।

পরিবারের অভিযোগ, ২৩ জুলাই রাতেই বখতিয়ারসহ ১৫ জনকে আসামি করে টেকনাফ থানায় একটি মাদক মামলা করা হয়। পরে অস্ত্র আইনে আরেকটি মামলা করা হয়, যাতে বখতিয়ারের তিন ছেলেকেও আসামি করা হয়। পরদিন ভোরে খবর আসে, টেকনাফের হ্নীলা এলাকায় পুলিশের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ বখতিয়ার মেম্বার ও মোহাম্মদ তাহের নিহত হয়েছেন। পরে তাদের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। এসব ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং তারা নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে।

বখতিয়ারের ছেলে হেলাল উদ্দিনের দাবি, তার বাবার বিরুদ্ধে এর আগে টেকনাফ বা উখিয়া থানায় কোনো মামলা বা সাধারণ ডায়েরি ছিল না। তিনি বলেন, পরিবারের কাছ থেকে ৫১ লাখ টাকার বেশি নগদ অর্থ ও জমির দলিল নেওয়া হলেও মামলার নথিতে পুরো অর্থের উল্লেখ নেই। পরিবারের সদস্যরা অর্থ ও দলিল ফেরত এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।

এদিকে বখতিয়ার মেম্বারের ঘটনার পর তৎকালীন উখিয়া থানার ওসি মর্জিনা আক্তারসহ চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগে আরেকটি মামলা হয়। ২০২০ সালের ২৫ আগস্ট কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩-এ মহেশখালীর তরুণী রিয়াদ সোলতানা নুরী মামলাটি করেন। মামলার অন্য আসামিরা হলেন কনস্টেবল মো. সুমন, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) নুরুল ইসলাম ও এএসআই মো. শামীম।

মামলার অভিযোগে নুরী দাবি করেন, কনস্টেবল সুমনের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং বিয়ের কথা বলে তাকে খুনিয়াপালং চেকপোস্টসংলগ্ন একটি কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে ধর্ষণের অভিযোগের পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, পরে উখিয়া থানায় গেলে ওসি মর্জিনা তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেন এবং অন্য পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতায় তাকে আটক ও মারধর করা হয়। এমনকি পায়ে রশি দিয়ে এবং হিজাব দিয়ে চোখ বেঁধে রাখার অভিযোগও করা হয়।

আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয়। তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের সত্যতা অস্বীকার বা ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল।

বখতিয়ার মেম্বারের পরিবারের অভিযোগ এবং মর্জিনা আক্তারের বিরুদ্ধে করা মামলার ঘটনাগুলো ২০২০ সালের কক্সবাজারের পুলিশি কর্মকাণ্ড ঘিরে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলোর অংশ। বিশেষ করে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান নিহত হওয়ার পর কক্সবাজারে পুলিশের কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’, আটক, অর্থ আদায় ও নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বখতিয়ার পরিবারের দাবি, তাদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে আদালত ও তদন্ত সংস্থার অনুসন্ধানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।