ঢাকা, সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৫:১৮:৪০ PM

রাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসমাইল জবিউল্লাহ

মান্নান মারুফ
17-08-2026 12:19:52 PM
রাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসমাইল জবিউল্লাহ

বাংলাদেশের প্রশাসন, কূটনীতি, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক নীতি প্রণয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার অধিকারী মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান, জেলা প্রশাসন থেকে সচিব পর্যায়ের দায়িত্ব পালন, আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপির নীতি ও নির্বাচন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা—বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের নানা পর্যায়ে তিনি যুক্ত ছিলেন রাষ্ট্র ও জনসেবার গুরুত্বপূর্ণ কাজে। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে মন্ত্রী পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটেও তাঁকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ১৯৫০ সালে তৎকালীন নোয়াখালী জেলার রামগতি থানার শান্তির হাট (চরকাদিরা) এলাকার মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মরহুম সুজাউদ্দিন আহমেদ ছিলেন লক্ষ্মীপুর সামাদ একাডেমির শিক্ষক। পরে পরিবার লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার শমসেরবাদে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।

শিক্ষাজীবনে মেধার স্বাক্ষর রাখেন তিনি। ১৯৬৫ সালে লক্ষ্মীপুর সামাদ একাডেমি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের মেধাতালিকায় ১২তম এবং ১৯৬৭ সালে লক্ষ্মীপুর কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন বলে তাঁর জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করা হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি এলএলবিতেও কৃতিত্ব দেখান। যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাপানের এডিবি ইনস্টিটিউটেও উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

শিক্ষকতা থেকে প্রশাসনে

১৯৭৩ সালে চৌমুহনী কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ইসমাইল জবিউল্লাহ। একই সময়ে চন্দ্রগঞ্জ কফিলউদ্দিন কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন এবং পরে নোয়াখালী সরকারি কলেজেও ইংরেজির প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসনে প্রবেশ করেন। ১৯৭৭ সালে সহকারী কমিশনার ও ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে চট্টগ্রামে কর্মজীবন শুরু হয় তাঁর। পরবর্তী সময়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ম্যাজিস্ট্রেট ও সামরিক আইন আদালতের বিচারকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

যোগাযোগ, স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। ১৯৮৬ সালে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ২০০২ সালে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে যোগাযোগ, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ২০০৮ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভিজ্ঞতা

ইসমাইল জবিউল্লাহর কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আন্তর্জাতিক অঙ্গন। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ব্রুনাই ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে শ্রম কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও ফোরামেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি।

বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিকল্প গভর্নর, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (IMO) সদস্য, ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির গভর্নর এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। জাতিসংঘ, ওআইসি, কমনওয়েলথ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন বলে তাঁর পরিচিতি ও দলীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়।

২০২৬ সালের জুনে বিএনপির প্রতিনিধি হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব এশিয়ান পলিটিক্যাল পার্টিজের (ICAPP) স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে তাঁকে মনোনীত করা হয়।

বিএনপির নীতি ও নির্বাচন কার্যক্রমে ভূমিকা

সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর বিএনপির নীতি, গবেষণা, নির্বাচন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন ইসমাইল জবিউল্লাহ। ২০২৬ সালের বিভিন্ন দলীয় কার্যক্রমে তাঁকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে তাঁকে প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিএনপির নিজস্ব ঘোষণাতেও তাঁর নাম প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিএনপির একাধিক বৈঠকেও তিনি দলীয় প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন।

দলের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাষ্ট্র সংস্কার, প্রশাসন ও নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন আলোচনাতেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। জুলাই-পরবর্তী সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিএনপির প্রতিনিধি হিসেবেও তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে অংশ নিয়েছেন বলে দলীয় ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জনপ্রশাসন উপদেষ্টা

২০২৬ সালে নতুন সরকারের গঠিত উপদেষ্টা পরিষদে মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে মন্ত্রী পদমর্যাদা দেওয়া হয়। বর্তমানে জনপ্রশাসনের দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও জনসেবার মানোন্নয়ন নিয়ে তিনি কাজ করছেন। সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে তিনি সরকারি কার্যক্রমে সময়, অর্থ ও জনশক্তির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

লক্ষ্মীপুরের সঙ্গে সম্পৃক্ততা

দীর্ঘ সরকারি ও রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি নিজ জেলা লক্ষ্মীপুরের শিক্ষা, যোগাযোগ ও সামাজিক উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকার কথা স্থানীয়ভাবে আলোচিত। শিক্ষকতা জীবনে বহু শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারি দায়িত্বে থাকাকালে এলাকার শিক্ষা, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার দাবি রয়েছে তাঁর অনুসারীদের। সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তাঁর আগ্রহ ছিল দীর্ঘদিনের।

সব মিলিয়ে শিক্ষকতা, প্রশাসন, বিচারিক দায়িত্ব, কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, গবেষণা এবং রাজনৈতিক নীতি প্রণয়নের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বাংলাদেশের জনপরিসরে একটি বহুমাত্রিক পরিচয় তৈরি করেছেন। বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা এবং একই সঙ্গে সরকারের জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন—এই দুই অভিজ্ঞতা তাঁকে সমসাময়িক রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক নীতি আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত করেছে। তবে বর্তমানে তাঁকে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে উল্লেখ করার পরিবর্তে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করাই সাম্প্রতিক যাচাইযোগ্য তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।