বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম তোফায়েল আহমেদ। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তিনি দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে ২০২৬ সালের ১ জুন ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
জন্ম ও শিক্ষা
তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা জেলার সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোরালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বরিশালের ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্ররাজনীতিতে উত্থান
ছাত্রজীবনেই তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন।
একই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন তোফায়েল আহমেদ। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। মাত্র ২৭ বছর বয়সে জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে তাঁর দৃঢ় অবস্থান তৈরি হয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুজিব বাহিনীর চার প্রধান নেতার একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক জীবন
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন, যা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন পদ ছিল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রায় ৩৩ মাস কারাভোগের পর মুক্তি পান। এরপর আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন ও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। বিশেষ করে এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনে তিনি সামনের সারির নেতাদের একজন ছিলেন।
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তিনি একাধিকবার ভোলা-১ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন।
রাজনৈতিক অবস্থান ও বিতর্ক
রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ নানা পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জের সাক্ষী ছিলেন। বিশেষ করে ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আওয়ামী লীগের কিছু জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে দলীয় সংস্কার প্রসঙ্গে তাঁর নাম আলোচনায় আসে। পরবর্তীকালে এ বিষয়টি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নানা আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় অবস্থান ও মতপার্থক্য থাকলেও তোফায়েল আহমেদ আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত দলটির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা হিসেবে তিনি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।