ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৩:০৩:১৬ AM

মসজিদ নির্মাণে অনিয়মের বিস্ফোরক অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
22-07-2026 01:30:50 PM
মসজিদ নির্মাণে অনিয়মের বিস্ফোরক অভিযোগ

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগ-৫–এর নির্বাহী প্রকৌশলী তামজীদ এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রাজিয়া সুলতানাকে ঘিরে টেন্ডার প্রক্রিয়া, কার্যাদেশ প্রদান এবং বিল পরিশোধ নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। বিভাগজুড়ে এসব অভিযোগ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বরাদ্দ সংকট থাকা সত্ত্বেও মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে একের পর এক এস্টিমেট অনুমোদন ও পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে সুপ্রিম কোর্ট মাজার মসজিদের নির্মাণাধীন পাঁচতলা ভবনের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) কাজ নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, ভবনের নির্মাণকাজ এখনও সম্পূর্ণ শেষ না হলেও সংশ্লিষ্ট ই/এম কাজের অধিকাংশ টেন্ডার সম্পন্ন করে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের শেষ নাগাদ ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ সরেজমিনে দেখা গেছে, পাঁচতলা ভবনের পঞ্চম তলার কাজ এখনও চলমান এবং ভবনের একটি তলার নির্মাণকাজ বাকি রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ওটিএম টেন্ডার আইডি ১০০২৬৪৬–এর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট মাজার মসজিদের জন্য ১০০০ কেভিএ সাবস্টেশন স্থাপনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, দুটি করে সিডিউল বিক্রি ও জমা দেখিয়ে প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডারের পরিবেশ সৃষ্টি করা হলেও কার্যাদেশ দেওয়া হয় মেসার্স মামুন অ্যান্ড ব্রাদার্সকে। এ কাজের চুক্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ৯৮ লাখ ৩৪ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ এপিপি অনুযায়ী বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৯৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকৃত প্রতিযোগিতা হলে অন্তত ১০ শতাংশ কম দর পাওয়া সম্ভব ছিল, ফলে সরকারের প্রায় ১৯ থেকে ২০ লাখ টাকা সাশ্রয় হতে পারত। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় ছিল ১০ জুন ২০২৫।

এ প্রকল্প নিয়েও আরেকটি প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, সাবস্টেশনের মালামাল দেড় থেকে দুই বছর আগে সরবরাহ করে গুদামজাত করা হলেও দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকার পর এসব বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যকর থাকবে কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

একই অর্থবছরে টেন্ডার আইডি ১০৩৭৪১০–এর মাধ্যমে ২৫০ কেভিএ জেনারেটর সরবরাহ ও স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, একই পদ্ধতিতে সীমিত প্রতিযোগিতা দেখিয়ে গেজ বাংলাদেশ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় জুন ২০২৫। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র না হওয়ায় মাত্র ৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ কম দরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া টেন্ডার আইডি ১২২০২৫৭–এর মাধ্যমে ৬৩০ কেজি ধারণক্ষমতার একটি প্যাসেঞ্জার লিফট সরবরাহ ও স্থাপনের কাজ, টেন্ডার আইডি ১১২৯৮৩৩–এর মাধ্যমে দুটি এসকেলেটর সরবরাহ ও স্থাপন এবং টেন্ডার আইডি ১১৯০০১৪–এর মাধ্যমে আরও একটি ৬৩০ কেজি প্যাসেঞ্জার লিফট স্থাপনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এসব কাজের বরাদ্দ যথাক্রমে ৬৩ লাখ ৬ হাজার, প্রায় ২ কোটি ১৮ লাখ এবং ৮৩ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের অভিযোগ, এসব টেন্ডারেও প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা হয়নি এবং পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ আরও রয়েছে, একই প্রকল্পের আওতায় তিন গ্রুপে ফায়ার এক্সটিংগুইশার, ১০০০ কেজি ফায়ার-কাম-প্যাসেঞ্জার লিফট, ফোর্স ভেন্টিলেশন সিস্টেম, সোলার ও সার্জ প্রোটেকশন ব্যবস্থা, বিশেষ আলোকসজ্জা, কম্পাউন্ড সিকিউরিটি লাইট, সাউন্ড সিস্টেম, সিসিটিভি, পিএবিএক্স, নেটওয়ার্কিং এবং প্রায় ৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকার ভিআরএফ ও স্প্লিট টাইপ এয়ার কুলিং সিস্টেমসহ বিভিন্ন কাজের বিপরীতে বরাদ্দের অর্থ ছাড় ও বিল পরিশোধ করা হয়েছে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সরঞ্জামের অনেকগুলোর বাস্তব সরবরাহ, সংরক্ষণ ও স্থাপনের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রাজিয়া সুলতানার বিরুদ্ধেও ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তার অধীনস্থ অনেক প্রকল্পে ঠিকাদারদের নিয়মিতভাবে মাঠে কাজ করতে হয় না; বরং নির্দিষ্ট শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে বিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সরকারি নথি উপস্থাপিত হয়নি।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, রাজিয়া সুলতানা অতীতে রংপুরে দায়িত্ব পালনকালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও নভো থিয়েটারসহ কয়েকটি প্রকল্পের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজে অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে আর্থিক অনিয়ম করেছেন। তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব অভিযোগ অভিযোগকারী, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এবং বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযুক্ত প্রকৌশলীদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে বিষয়গুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল।