দেশে শিশু, নারী ও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলাকেটে হত্যার নৃশংস ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সমাজে ক্রমবর্ধমান এক ধরনের ‘প্যান্ডেমিক হিংস্রতা’র প্রতিফলন, যা বিচারহীনতা, সামাজিক অস্থিরতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের ফল।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ মে সকালে বড় বোনের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল রামিসার। কিন্তু হঠাৎ তাকে খুঁজে না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা আশপাশে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে পাশের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে তার একটি জুতা দেখতে পান মা। অভিযুক্ত সোহেল রানা ও রামিসার পরিবার পাশাপাশি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। দীর্ঘ সময় দরজায় কড়া নাড়ার পরও কোনো সাড়া না পেয়ে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে শয়নকক্ষের মেঝে থেকে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং টয়লেটের একটি বালতি থেকে তার বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করে। ঘটনাটি দেশের মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
তবে পল্লবীর এই ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ের একমাত্র ভয়াবহ অপরাধ নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত শিশু, নারী ও সাধারণ মানুষ নৃশংস নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রকাশিত তথ্য বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশে ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ জন শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে আরও তিনজনকে। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় ১১৫ জন শিশু নিহত হয়েছে।
অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ১ হাজার ৮৯০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছে ৪৮৩ জন। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই ৫১৯ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ১৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান দেশের শিশু নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
একই সঙ্গে মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় ২৮১ জন নিহত হয়েছেন। এ সময় গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫৩ জন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছেন আরও ৪০ জন। এসব তথ্য সমাজে সহিংসতার বহুমাত্রিক বিস্তারের চিত্র তুলে ধরে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানুষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান নিষ্ঠুরতা ও সহিংসতার পেছনে নানা মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণ কাজ করছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহানা পারভীনের মতে, বর্তমানে প্রতিশোধ ও ক্ষমতা প্রদর্শন সমাজে এক ধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ফলে মানুষ সামান্য কারণেও চরম সহিংস আচরণে জড়িয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, চলচ্চিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কখনো কখনো বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও অপরাধীদের নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে কিছু মানুষের মধ্যে ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রবণতা ও বিকৃত মানসিকতা তৈরি হয়। অনেক ব্যক্তি নিজেদের হীনমন্যতা বা ব্যর্থতা ঢাকতে অন্যকে নির্যাতন করে কিংবা মরদেহ বিকৃত করার মতো জঘন্য অপরাধের মাধ্যমে এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি লাভ করে। এ ধরনের আচরণ সমাজে সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণকে আরও উৎসাহিত করছে।
তবে অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও ধীরগতিকে দায়ী করছেন আইনজ্ঞরা। অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিমের মতে, একটি হত্যা মামলার বিচারিক আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত এবং রাষ্ট্রপতির বিবেচনাসহ সম্পূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর সময় লেগে যায়। ফলে অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত শাস্তি কার্যকর না হওয়ায় সমাজে এর প্রতিরোধমূলক প্রভাব পড়ে না।
তিনি বলেন, যখন অপরাধীরা দেখে যে বিচারের প্রক্রিয়া দীর্ঘ এবং শাস্তি কার্যকর হতে বহু বছর সময় লাগে, তখন তাদের মধ্যে আইনের প্রতি ভয় কমে যায়। ফলে অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা বাড়তে থাকে। আলোচিত ফেনী মাদ্রাসাছাত্রী হত্যা মামলার দ্রুত রায় দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় ধরে তা কার্যকর না হওয়ায় সমাজে কাঙ্ক্ষিত বার্তা পৌঁছায়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সহিংসতাকে ঘিরে সামাজিক সহনশীলতা—সব মিলিয়ে দেশে এক ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শিশু ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত বিচার, কার্যকর আইন প্রয়োগ, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক মূল্যবোধ পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
দেশের ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতার এই চিত্র শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এই ‘প্যান্ডেমিক হিংস্রতা’ ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, যা সমাজের নিরাপত্তা, মানবিকতা এবং সভ্যতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।