ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার প্রকল্পে কাজ সম্পূর্ণ শেষ না করেই প্রায় ৩২৭ কোটি টাকার বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ৪ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত করেছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। আইএমইডির নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন এবং সরকারের অডিট বিভাগের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণ এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে ২০১৮ সালে শিল্প মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করে। প্রকল্পটি ২০২৪ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি।
ব্যয় ও সময় দুটোই বেড়েছে
২০১৮ সালের অক্টোবরে একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় এর ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১০ হাজার ৪৬০ কোটি ৯১ লাখ টাকা এবং মেয়াদ ছিল ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বাড়িয়ে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি ২০ লাখ টাকা করা হয়, যা আগের তুলনায় প্রায় ৪৮ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়।
পরবর্তীতে কাজ শেষ না হওয়ায় আবারও দুই বছর সময় বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হলেও প্রকল্পটি এখনও অসম্পূর্ণ রয়েছে। আইএমইডির মতে, রেললাইনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত কাজ শেষ না হওয়ায় পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। মূল পরিকল্পনার তুলনায় ছয় বছরের বিলম্বকে প্রকল্পের অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩০টি অডিট আপত্তি এখনও নিষ্পত্তিহীন
২০১৯-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পের ওপর মোট ৬৮টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টির নিষ্পত্তি হলেও ৩০টি এখনও অনিষ্পন্ন রয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে আপত্তিকৃত অর্থের পরিমাণ ৪ হাজার ৭৫৮ কোটি ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৭ টাকা। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রায় আপত্তিকৃত অর্থের মধ্যে রয়েছে ৭৪ কোটি ৮৩ লাখ ৪৫ হাজার ৩৬৩ মার্কিন ডলার এবং ৩ হাজার ৪৩৪ কোটি ৯২ লাখ ৫ হাজার জাপানি ইয়েন।
সবচেয়ে বড় আপত্তি উঠেছে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা নিয়ে। কারখানার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৯ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৮ লাখ ১৪ হাজার ৭৫৬ মেট্রিক টন। এ কারণে ২ হাজার ২১৩ কোটি ৯ লাখ ২৮ হাজার টাকার অডিট আপত্তি এখনও বহাল রয়েছে।
কাজ শেষের আগেই বিল পরিশোধের অভিযোগ
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের শতভাগ কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে ফাইনাল এক্সেপ্টেন্স সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। এর ভিত্তিতে ১ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার এবং ১৩৪ কোটি জাপানি ইয়েন পরিশোধ করা হয়েছে।
এছাড়া কাজ সম্পাদন না করেই ৩৪ লাখ ১৯ হাজার ৩৩৬ টাকা, প্রকৃত কাজের তুলনায় অতিরিক্ত ৫ লাখ ২৫ হাজার ৪৮১ টাকা এবং লোকোমোটিভ স্থাপন ছাড়াই ১২ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৩ মার্কিন ডলারের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এসব অর্থের মোট পরিমাণ প্রায় ৩২৭ কোটি টাকা।
টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ
প্রকল্পের মূল প্ল্যান্ট নির্মাণে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর)-২০০৮ লঙ্ঘন এবং যোগসাজশের মাধ্যমে প্রায় ৭৩ কোটি মার্কিন ডলার ও ৩ হাজার ৩০০ কোটি জাপানি ইয়েনের সমন্বিত টেন্ডার সাধারণ ঠিকাদারকে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
আবাসিক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও সর্বনিম্ন দরদাতাকে অযৌক্তিকভাবে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। অডিট বিভাগ পুরো প্রক্রিয়াকে 'কোলিউসিভ প্র্যাকটিস' বা পারস্পরিক যোগসাজশ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অতিরিক্ত ও অনিয়মিত ব্যয়
অডিট প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ড্রয়িং ও ডিজাইনের বাইরে অতিরিক্ত মাটি ভরাট, প্রকৃত কাজের তুলনায় অতিরিক্ত বিল, চুক্তি লঙ্ঘন করে ১০৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকার বেশি অর্থ পরিশোধ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, পরিবেশ ও সামাজিক তদারকির প্রমাণ ছাড়াই ব্যয়, পোর্ট ডিটেনশন চার্জ এবং পরামর্শক নিয়োগে অনিয়মসহ বিভিন্ন খাতে শত শত কোটি টাকার অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে।
এছাড়া ডিপোজিট ওয়ার্কসের মাধ্যমে রেলওয়েকে ২১৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং তিতাস গ্যাসকে ৪৯ কোটি ৮ লাখ টাকার বেশি অর্থ অনিয়মিতভাবে প্রদান করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বরাদ্দের বাইরে ব্যয় ও রাজস্ব ক্ষতি
সংশোধিত এডিপি বরাদ্দের বাইরে প্রকল্পে অতিরিক্ত ৫৪০ কোটি ৩৩ লাখ টাকার ব্যয় হয়েছে। সমঝোতা স্মারক ছাড়াই বিভিন্ন সংস্থাকে অগ্রিম অর্থ প্রদান, প্রকল্পের আওতার বাইরে পেনশন ও গ্র্যাচুইটি পরিশোধ, বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার পরও প্রকল্প তহবিল থেকে গ্যাস বিল পরিশোধ এবং অপ্রয়োজনীয় হেলিপ্যাড নির্মাণের বিষয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে।
এছাড়া ভ্যাট ও আয়কর কম কেটে বিল পরিশোধ করায় সরকারের প্রায় ৩৯ কোটি ৩০ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। তিতাস গ্যাসকে দেওয়া অগ্রিম অর্থের সুদ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় আরও প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নিম্নমানের অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
আইএমইডির পরিদর্শনে আবাসিক ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে নিম্নমানের ইট, ত্রুটিপূর্ণ ঢালাই, দুর্বল ফিনিশিং এবং স্কুল-কলেজ ভবনের বারান্দার রেলিংয়ের উচ্চতা কম থাকার বিষয়টি ধরা পড়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা প্রকাশ করে রেলিংয়ের উচ্চতা ৩৬ ইঞ্চি থেকে ৪২ ইঞ্চি করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্মাণকাজে শ্রমিকদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ঘাটতির কথা বলা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য
কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই ফাইনাল এক্সেপ্টেন্স সার্টিফিকেট প্রদান এবং ৩২৭ কোটি টাকার বিল পরিশোধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রকল্প পরিচালক মো. সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, "এমন কিছু ঘটেনি।"
মেয়াদ বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, প্রকল্পের একটি অংশ বাংলাদেশ রেলওয়ের তত্ত্বাবধানে ডিপোজিট ওয়ার্ক হিসেবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ওই কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করা সম্ভব নয়। এছাড়া আবাসন খাতের কিছু কাজও এখনও বাকি রয়েছে, যার প্রায় ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর আশা, ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই সব কাজ শেষ হবে।
তিনি আরও বলেন, "২০২৪ সালের ১ জুলাই প্রকল্পটির কমিশনিং সম্পন্ন হওয়ার পর আমি প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি। প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের অক্টোবরে।"
আইএমইডি ও অডিট বিভাগ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, অধিকাংশ গুরুতর অনিয়ম এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাব অনেক ক্ষেত্রে সন্তোষজনক না হওয়ায় দ্রুত তদন্ত, অনিয়মের প্রতিকার এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে।