জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে (এনএসসি) দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতির বলয় সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিষদের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও একটি প্রভাবশালী চক্র নিজেদের অবস্থান অক্ষুণ্ন রেখে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য, কেনাকাটায় অনিয়ম, তথ্য পাচার, চাঁদাবাজি এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের মতো নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন পরিষদের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক এক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) দায়িত্বে থাকাকালে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, ওই বলয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আর্থিক কর্মকাণ্ডে অনিয়ম সংঘটিত হয়। পরবর্তীতে তিনি দায়িত্ব ছাড়লেও সেই বলয় নতুন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেদের নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এসব ব্যক্তি বর্তমানে বিএনপির সমর্থক পরিচয় দিয়ে প্রশাসনে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
ডেসপাচ রাইডার হিসেবে কর্মরত থাকা আবদুল মালেককে ঘিরেও রয়েছে একাধিক অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি তৎকালীন সচিবের ঘনিষ্ঠ হয়ে বদলি বাণিজ্য, ক্রয়সংক্রান্ত কার্যক্রম এবং বিভিন্ন সরবরাহকাজে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে পরিষদের অভ্যন্তরীণ তথ্য বাইরে পাচারের ক্ষেত্রেও তাকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা।
সূত্রের দাবি, আবদুল মালেক পিআরএলে (PRL) গেলেও এখনও তাকে মৌখিকভাবে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অবসরে যাওয়ার পরও তাকে দিয়ে পরিষদের বিভিন্ন গোপনীয় কাজ করানো হচ্ছে, যা প্রশাসনিক বিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ বিষয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে।
প্রকৌশলী নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, তিনি রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে বর্তমানে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছেন। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্বকালেও বিভিন্ন ক্রয়কাজে অনিয়ম হয়েছে। প্লাস্টিকের ফুল, ফুলের টব এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নামে কয়েক লাখ টাকার বিল উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে অতীতেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া সনদ ব্যবহার করে চাকরি গ্রহণ, সরকারি মালামাল চুরির অভিযোগ এবং নারীসংক্রান্ত বিতর্কের ঘটনায় তিনি একাধিকবার অভিযুক্ত হন। বিভাগীয় তদন্তে তাকে পদাবনতি দেওয়া হয়েছিল এবং এক পর্যায়ে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়। তবে পরবর্তীতে তিনি চাকরিতে বহাল থাকেন।
অভিযোগকারীদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সামনের সারিতে সক্রিয় থাকলেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে আবারও প্রভাব বিস্তার করছেন। বিপরীতে দীর্ঘদিনের বিরোধী মতাদর্শের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
চেয়ারম্যানের পিয়ন মো. শাহজাহান শেখের বিরুদ্ধেও একই কর্মস্থলে দীর্ঘ ২৭ বছর কর্মরত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অতীতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকলেও বর্তমানে তিনি নিজেকে বিএনপির নির্যাতিত কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা প্রশাসনের প্রভাবশালী কয়েকজন কর্মকর্তার সহযোগিতায় বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তা বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রশাসনে সক্রিয় রয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
উচ্চমান সহকারী এস এম ইদ্রিস আলীর বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা স্টেডিয়ামের পুরোনো মালামাল বিক্রির নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জাতীয় স্টেডিয়াম এলাকায় চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এস এম ইদ্রিস আলী। তার দাবি, ফতুল্লা স্টেডিয়ামের মালামাল বিক্রির অর্থ তিনি গ্রহণ করেননি; অন্য একজন কর্মকর্তা বিষয়টি দেখভাল করেছেন। জাতীয় স্টেডিয়ামে চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি বড় একটি চক্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং প্রশাসনের একার পক্ষে তা বন্ধ করা সম্ভব নয়। ময়মনসিংহে তার বাড়ি নির্মাণের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, পুরোনো বাড়ি বিক্রি করে বৈধ অর্থেই নতুন বাড়ি নির্মাণ করেছেন।
অন্যদিকে, মাঠ কর্মচারী গোলাম মোস্তফা সরকারের পরিচালিত ক্যান্টিন নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে কম খরচে পরিচালিত হওয়ার পরও কর্মকর্তা-কর্মচারী ও খেলোয়াড়দের নিম্নমানের খাবার উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বহন করে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় এই অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রশাসনিক কাঠামোকে দুর্বল করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে কাজ করছে। তারা চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়ে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
অভিযোগকারীদের প্রত্যাশা, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। তাদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ক্রীড়াঙ্গনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে এবং প্রশাসনের প্রতি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে। পাশাপাশি সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার মাধ্যমে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন।