কাস্টমসের চাকরি মানেই বিপুল সম্পদের মালিক—এমন একটি প্রচলিত ধারণা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। এবার সেই ধারণাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব কর্মকর্তা আলতাফ হোসেনকে ঘিরে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, মাত্র এক যুগের চাকরি জীবনে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার সম্পদের উৎস, আয় ও ব্যয়ের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
আলতাফ হোসেন বর্তমানে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০১৪ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীনে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। এরপর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দায়িত্ব পালন করেন। তার কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে কিশোরগঞ্জ, খুলনা, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং সর্বশেষ চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে পদায়ন হয়।
অভিযোগ রয়েছে, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রভাবশালী একটি মহলের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ার ফ্রেইট ইউনিটে দায়িত্ব পালনের সময় তার বিরুদ্ধে অনিয়মের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা প্রমাণিত কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, শুল্ক গোয়েন্দা দপ্তরে সাধারণত একটি পদে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দায়িত্ব পালনের নিয়ম থাকলেও আলতাফ হোসেনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটেছিল। দীর্ঘ সময় একই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার সুযোগ পাওয়ার পেছনে প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
আলতাফ হোসেনের গ্রামের বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ফুলহাতা গ্রামে। স্থানীয়দের বরাতে জানা যায়, বর্তমানে তিনি এলাকায় বিপুল সম্পদের মালিক হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, তার গ্রামের বাড়িতেও বড় ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে তার সম্পত্তি রয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগকারীদের মতে, দশম গ্রেডের একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিজীবনের আয় দিয়ে রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও অন্যান্য সম্পদের মালিক হওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের দাবি, গত প্রায় ১১ বছরের চাকরি জীবনে তার সরকারি বেতন থেকে যে পরিমাণ আয় হয়েছে, তার সঙ্গে বর্তমান সম্পদের সামঞ্জস্য যাচাই করা প্রয়োজন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর দনিয়া এলাকার পূর্ব রসুলপুরে তার একটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রসুলপুরের মাস্টার বাড়ি এলাকায় নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবনে তার আরও একটি ফ্ল্যাট থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি স্ত্রী ও আত্মীয়-স্বজনের নামে বিভিন্ন সম্পদ এবং আর্থিক বিনিয়োগ থাকার অভিযোগও রয়েছে।
সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি আন্দোলনে আলতাফ হোসেনের সক্রিয় ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ওই আন্দোলনে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছেন। তবে এ বিষয়ে তার বক্তব্য এবং আন্দোলনের প্রকৃত ভূমিকা সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের আরও ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
এদিকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে তার দায়িত্ব পালন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিযোগ, বিভিন্ন ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে আলতাফ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার না করে বলেন, তার কিছু সম্পদ রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব দেবেন। তবে তার বক্তব্যের বিষয়ে বিস্তারিত যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তার সম্পদের পরিমাণ, আয়ের উৎস এবং চাকরির সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই করা দুর্নীতি প্রতিরোধের অংশ। তাই আলতাফ হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলে।