বৈদেশিক কর্মসংস্থানের নামে নারী ও কিশোরীদের বিদেশে পাচার, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগে ৫৭টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। উন্নত জীবন ও উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে এসব অপরাধ সংঘটিত করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে গত ২৩ জুলাই জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে দুদক। বিএমইটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। চিঠিতে অভিযুক্ত ৫৭টি এজেন্সির যাবতীয় তথ্য, নথিপত্র, মালিকানার বিস্তারিত এবং লাইসেন্স প্রদানের ভিত্তি ও কার্যক্রমের বিবরণ চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এসব এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো কর্মীদের নথিপত্র এবং এজেন্সি অনুমোদনে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট মালিকদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে।
তদন্তের পটভূমি ও মামলার বিবরণ
অভিযানের গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গত বছর বিএমইটিতে অভিযান চালায় দুদক। সে সময় বেশ কয়েকটি এজেন্সির বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘন করে নারী পাচারের প্রাথমিক প্রমাণ মেলে। পরবর্তীতে ধারাবাহিক অভিযানে বহু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র জব্দ করা হয়।
নথিপত্র পর্যালোচনার ভিত্তিতে গত বছরের ৩ জুলাই মামলা দায়ের করে দুদক। জালিয়াতির মাধ্যমে ভূয়া কাগজপত্র তৈরি করে নারী পাচারে সহায়তার অভিযোগে বিএমইটির চার কর্মকর্তা এবং পাঁচটি এজেন্সির মালিক ও কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়। পরবর্তীতে এই মামলার অধিকতর তদন্তে নেমে আরও ৫৭টি এজেন্সির সরাসরি সম্পৃক্ততা উন্মোচিত হয়।
মামলার আসামিবৃন্দ
বিএমইটি কর্মকর্তা: উপপরিচালক (বহির্গমন) মো. সাজ্জাদ হোসেন সরকার, সহকারী পরিচালক (বহির্গমন) মো. হোসেন উল্লাহ আকন্দ, জনশক্তি জরিপ কর্মকর্তা মো. নিজামউদ্দিন পাটোয়ারি এবং অফিস সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটর মো. আজাদ হোসেন।
এজেন্সি প্রতিনিধি: এইচ এ ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজিং পার্টনার মো. আনোয়ার হোসেন, কে এইচ ওভারসিজের ম্যানেজিং পার্টনার মো. সালাউদ্দিন, মক্কা ওভারসিজের স্বত্বাধিকারী মো. জামাল হোসেন, তাসনিম ওভারসিজের ম্যানেজিং পার্টনার মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া এবং এস এম ম্যানপাওয়ারের অংশীদার একরামুল হক।
জালিয়াতির কৌশল ও অনিয়ম
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ২৯ মে রাজধানীর বিএমইটি কার্যালয়ে পরিচালিত অভিযানে চক্রের প্রধান অনিয়মগুলো ধরা পড়ে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো পরস্পর যোগসাজশে মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী পাঠানোর উদ্দেশ্যে নারীদের ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করত।
প্রকৃত আবেদনকারীর পরিবর্তে অন্য নারীর পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে আবেদন জমা দেওয়া হতো এবং বিএমইটির ডেটাবেজে কোনো প্রকার যাচাই ছাড়াই ছাড়পত্রের অনুমোদন নিশ্চিত করা হতো। এছাড়া সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ২৫ বছরের কম বয়সি নারীদেরও ছাড়পত্র দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে, যা সরকারি পরিপত্রের সরাসরি লঙ্ঘন। এই অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিএমইটি কর্মকর্তারা বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধা লাভ করেছেন।
তালিকায় থাকা ৫৭টি রিক্রুটিং এজেন্সি
দুদকের অনুসন্ধানে আসা ৫৭টি এজেন্সির মধ্যে রয়েছে:
টি-টুয়েন্টি ওভারসিজ লিমিটেড (আরএল: ১৪১৫)
শিমুল এয়ার ওভারসিজ লিমিটেড (আরএল: ১৮০৩)
মাহি বিজনেস লিমিটেড (আরএল: ০৮০২)
মেসার্স দ্য বাংলাদেশ ট্রেড করপোরেশন (আরএল: ১২০৭)
মেসার্স জিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং (আরএল: ০০২৩)
প্রসেস ওভারসিজ (আরএল: ১২০৪)
গুডলেস সার্ভিস লিমিটেড (আরএল: ২০৬৮)
সেন্ট্রাল ওভারসিজ (আরএল: ০১১২)
ইজি ওয়ে ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ১৬৪৯)
আলফাতিহ ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ১২১৩)
দি ইফতি ওভারসিজ (আরএল: ০৮৯৪)
আমিয়াল ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ১৩২৬)
লেবার এশিয়া লিমিটেড (আরএল: ১৭৩০)
জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানি (আরএল: ০৩২০)
আমির এভিয়েশন লিমিটেড (আরএল: ০৮৪০)
আজাজ বিজনেস ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ১৯৬৮)
সেইফওয়ে এমপ্লয়মেন্ট (আরএল: ১৪৮৩)
আল-জাবেশ এস্টাবলিশমেন্ট লিমিটেড (আরএল: ০৮৮৪)
ইফতি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ১২১২)
সালমাশ ওভারসিজ (আরএল: ০৭৬৫)
ভারসেটাইল ওভারসিজ লিমিটেড (আরএল: ১৫৮৫)
এবিএস ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ১৭৭১)
প্রতীক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস (আরএল: ০৫০৬)
ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ১২৬৮)
আল-জুহুর ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ১৩১১)
বিএন অ্যাসোসিয়েট (আরএল: ০৫৬৭)
বিপ্লব ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ০৩৩২)
ফালকন ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ০৬১৭)
শান ওভারসিজ (আরএল: ০৭৫৯)
রিমেল ওভারসিজ (আরএল: ০৭৪৫)
হিমেল এয়ার সার্ভিস (আরএল: ০৬৭৪)
দ্য উইশার ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ১১৪৯)
টিপিএস ৩৬০ বাংলাদেশ লিমিটেড (আরএল: ০৯৯৫)
টিএসও ওভারসিজ (আরএল: ১৭৫৫)
জাস্ট ওয়ে এভিয়েশন লিমিটেড (আরএল: ০৭২৬)
ফিউচার প্যালেস লিমিটেড (আরএল: ১৯০১)
গালফ ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ১২২১)
সাদমান ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ০৯৪৩)
সিটি এয়ার ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ০৫৭৬)
আল মাহমুদ ওভারসিজ (আরএল: ১৪১২)
ফার্স্ট এয়ার সার্ভিস (আরএল: ১৩৮৩)
নুসাইবা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ১৬১২)
আল মোবারক ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ০৫৪২)
তাসনিম ওভারসিজ (আরএল: ০৫৬৯)
মক্কা ওভারসিজ (আরএল: ১১৭৫)
আল মিশার ওভারসিজ (আরএল: ১২৩৫)
বাংলাদেশ এক্সপোর্ট করপোরেশন (আরএল: ০৮০৩)
কেএস ওভারসিজ (আরএল: ১৪২২)
এসএম ম্যানপাওয়ার লিমিটেড (আরএল: ১৩৭২)
রিফাত ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ০৬৯৩)
শাভিরা লিমিটেড (আরএল: ০৭১২)
রাতুল ট্রেডিং ওভারসিজ (আরএল: ০৭৭৭)
সিটিজেন্স এয়ার ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ১০৮৯)
আল হারামাইন ওভারসিজ (আরএল: ১১১৬)
বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (আরএল: ০১৪৭)
আল-ইমরান ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ০৭৮০)
এইচএ ইন্টারন্যাশনাল (আরএল: ০৪৬৯)
দুদকের বক্তব্য
ঘটনার বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজীর আহমেদ জানান, মামলা দায়েরের পর তদন্তকারী কর্মকর্তা বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখছেন। তদন্ত চলাকালে নতুন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কমিশনের অনুমোদনক্রমে চার্জশিটে তাদের নাম যুক্ত করা হবে। এই মামলার ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সাপেক্ষে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।