ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট অনুযায়ী দল নির্বাচনী অঙ্গীকার ও ৩১ দফা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণ আবারও বিএনপিকে বিজয়ী করেছে। আলহামদুলিল্লাহ। এ বিজয় বাংলাদেশের, এ বিজয় গণতন্ত্রের।” জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর দেশে জনগণের সরাসরি ভোটে জবাবদিহিমূলক সংসদ ও সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার
তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অকার্যকর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ পুনর্গঠনের মধ্য দিয়েই নতুন যাত্রা শুরু হবে। জনগণের রায় পেলে রাষ্ট্র মেরামতের যে রূপরেখা বিএনপি উপস্থাপন করেছিল, তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান তিনি।
তিনি উল্লেখ করেন, বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দলের সঙ্গে মতবিনিময়ের ভিত্তিতে প্রণীত ৩১ দফা এবং দলীয় ইশতেহারের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিএনপি কাজ করবে। একই সঙ্গে ‘জুলাই সনদে’ দেওয়া নোট অব ডিসেন্টসহ সংস্কার প্রক্রিয়ায় দল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে বলেও জানান।
জাতীয় ঐক্যের আহ্বান বক্তব্যে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও গণঅধিকার পরিষদসহ ৫১টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।
অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের পথ ও মত ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।”
সরকার ও বিরোধী দল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ
নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “যে কোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে। কোনো রকম অন্যায় বা বেআইনি কর্মকাণ্ড বরদাস্ত করা হবে না।”
তিনি জানান, সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিজয় মিছিল না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। শত উস্কানির মুখেও নেতাকর্মীদের শান্ত ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। দলমত, ধর্ম বা ভিন্নমত নির্বিশেষে দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ মেনে নেওয়া হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ
অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান।
দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা শহীদ ও হতাহত হয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, “যাদের রক্তের বিনিময়ে আজকের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, তাদের অবদান জাতি চিরকাল স্মরণ রাখবে।”
এ সময় তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন প্রয়াত খালেদা জিয়া–র কথা স্মরণ করে বলেন, দেশের এমন এক আনন্দঘন সময়ে তার অনুপস্থিতি দলকে ভারাক্রান্ত করেছে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের জন্য তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি।
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়
বক্তব্যের শেষাংশে তারেক রহমান বলেন, এখন দেশ গড়ার পালা। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বিশ্বের গণতান্ত্রিক শক্তি, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণকে আবারও অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, মেজর অব হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ডা. এজেডম জাহিদ হোসেন, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ড. মওদুদ আহমেদ পাভেলের সঞ্চালনায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, জয়নুল আবেদিন, শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ইসমাঈল জবিউল্লাহ, আন্তর্জাতিক সম্পাদক ব্যারিষ্টার নাসির উদ্দীন আহমেদ অসীম, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির, দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন প্রমুখ।