দেশে হাম পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি ও বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ সত্ত্বেও শিশুদের মধ্যে হাম এবং হামের উপসর্গজনিত মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা আশানুরূপভাবে কমছে না। এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করছেন, টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার আরও কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের হালনাগাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৩৩৪ শিশু। প্রতিবেদনের তথ্য সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার হিসাবের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৬ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। তবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সামগ্রিক চিত্র এখনও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে ৫০৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আরও ৯০ শিশু। ফলে মোট মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৯৪ জনে, যা প্রায় ৬০০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৪২ শিশু। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২৯২ জন রোগী। এ সময় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২০৪ শিশু। অন্যদিকে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ হাজার ৯০ জন। ফলে হাসপাতালগুলোতে এখনও বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত দেশে সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ৭৩ হাজার ৩৬২ জন। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হাম রোগী পাওয়া গেছে ৯ হাজার ১৩৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ৫৯ হাজার ১০৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ৫৪ হাজার ৮১২ জন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাম নিয়ন্ত্রণে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং শিশুদের হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়ার কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হলেও এখনও কিছু এলাকায় ঝুঁকি রয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একজন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নেই। হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য বিভাগ একযোগে কাজ করছে। তিনি বলেন, “পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”
তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টিকা প্রদানই যথেষ্ট নয়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের হাসপাতালে আনতে বিলম্ব হওয়া, অপুষ্টি, স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে জটিলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে দ্রুত অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই টিকাদানের পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
এদিকে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে শিশু রোগীর চাপ এখনও অনেক বেশি। প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। তবুও তারা নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
স্বাস্থ্য অধিদফতর অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, শিশুদের মধ্যে জ্বর, শরীরে লালচে দানা, কাশি, সর্দি বা চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিশুদের টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, সরকারের চলমান উদ্যোগ সত্ত্বেও হাম পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি, শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা এবং দ্রুত চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়া গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব হবে। বর্তমানে হাম প্রতিরোধ ও শিশু মৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।