ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন খুব কম ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের জীবন একসঙ্গে এতটা বিতর্ক, সহিংসতা, নিপীড়ন, প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক উত্থানের প্রতীক হয়ে উঠেছে, যেমনটি হয়েছিলেন Phoolan Devi। “ব্যান্ডিট কুইন” নামে পরিচিত এই নারী একদিকে ছিলেন অপরাধ ও প্রতিশোধের আলোচিত চরিত্র, অন্যদিকে ভারতের বহু প্রান্তিক মানুষের কাছে তিনি ছিলেন সামাজিক বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক।
ফুলন দেবীর জন্ম ১০ আগস্ট ১৯৬৩ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের জালাউন জেলার একটি দরিদ্র মল্লাহ পরিবারে। মল্লাহ সম্প্রদায় ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। শৈশব থেকেই তিনি দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সামাজিক অবহেলার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন।
খুব অল্প বয়সেই তার বিয়ে হয় এক বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে তিনি অভিযোগ করেন যে বৈবাহিক জীবনে তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। কিছুদিন পর তিনি পিতৃগৃহে ফিরে এলেও সমাজ ও পরিবারের নানা বিরোধের কারণে তার জীবন আরও জটিল হয়ে ওঠে।
১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে ফুলন দেবীর জীবন নাটকীয় মোড় নেয়। তিনি ডাকাতচক্রের হাতে অপহৃত হন এবং পরবর্তীতে সেই চক্রের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের মধ্যে জড়িয়ে পড়েন। তার জীবনের এই সময়কাল নিয়ে বহু ভিন্নমত ও বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন বিবরণে বলা হয়েছে যে তিনি উচ্চবর্ণের কিছু ব্যক্তির হাতে মারাত্মক নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন। তবে এ সংক্রান্ত অনেক ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিচারিক সত্যতা আজও বিতর্কিত রয়ে গেছে।
এরপর তিনি আবার সশস্ত্র দস্যু গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হন। ধীরে ধীরে তিনি নিজেই একটি প্রভাবশালী ডাকাতদলের নেতৃত্বে উঠে আসেন। ভারতের উত্তরাঞ্চলে তার নাম দ্রুত পরিচিত হয়ে ওঠে। সংবাদমাধ্যম তাকে “ব্যান্ডিট কুইন” নামে আখ্যায়িত করতে শুরু করে।
ফুলন দেবীর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো ১৯৮১ সালের বেহমাই হত্যাকাণ্ড। ওই ঘটনায় উত্তর প্রদেশের বেহমাই গ্রামে ২০-এর বেশি ঠাকুর সম্প্রদায়ের পুরুষকে হত্যা করা হয়। অভিযোগ ওঠে যে এই হত্যাকাণ্ড ফুলন দেবী ও তার সহযোগীরা সংঘটিত করেছিলেন। ঘটনাটি সারা ভারতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং তাকে জাতীয়ভাবে আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
তবে বেহমাই হত্যাকাণ্ডের ব্যাখ্যা নিয়ে সমাজে বিভক্তি তৈরি হয়। একদল মানুষ তাকে নির্মম হত্যাকারী হিসেবে দেখেছে। অন্যদিকে বহু নিম্নবর্ণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ মনে করতেন যে তিনি দীর্ঘদিনের সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
বেহমাই হত্যাকাণ্ডের পর ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে ধরতে ব্যাপক অভিযান চালায়। অবশেষে ১৯৮৩ সালে তিনি মধ্যপ্রদেশে আত্মসমর্পণ করেন। আত্মসমর্পণের ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত আলোচিত এবং হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তিনি দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটান।
প্রায় ১১ বছর কারাগারে থাকার পর ১৯৯৪ সালে তার বিরুদ্ধে থাকা বেশ কয়েকটি মামলা প্রত্যাহার করা হয় এবং তিনি মুক্তি লাভ করেন। মুক্তির পর তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন এবং Samajwadi Party-এর হয়ে কাজ শুরু করেন। পরে তিনি উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর আসন থেকে ভারতের লোকসভায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার এবং ১৯৯৯ সালে দ্বিতীয়বার তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
সংসদ সদস্য হিসেবে ফুলন দেবী দরিদ্র জনগোষ্ঠী, নারী অধিকার এবং নিম্নবর্ণের মানুষের সমস্যা নিয়ে কথা বলতেন। তার সমর্থকদের মতে, তিনি এমন এক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক ছিলেন যেখানে জন্মগত পরিচয়ের কারণে মানুষ বৈষম্যের শিকার হয়।
তবে তার রাজনৈতিক জীবনও বিতর্কমুক্ত ছিল না। বেহমাই হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি এবং তার অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত ছিল। অনেকেই মনে করতেন, তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিচার কখনও সম্পন্ন হয়নি।
২৫ জুলাই ২০০১ সালে দিল্লিতে নিজের সরকারি বাসভবনের সামনে বন্দুকধারীদের গুলিতে ফুলন দেবী নিহত হন। সে সময় তিনি কর্মরত সংসদ সদস্য ছিলেন। পরে Sher Singh Rana আত্মসমর্পণ করে দাবি করেন যে বেহমাই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতেই তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।
তার মৃত্যুর পর উত্তর প্রদেশের মির্জাপুরে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। সমসাময়িক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে হাজারো সমর্থক ও দলীয় কর্মীর উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অনেকেই “ফুলন দেবী অমর রহে” স্লোগান দেন এবং তাকে শ্রদ্ধা জানান।
আজও ফুলন দেবীকে ঘিরে বিতর্ক শেষ হয়নি। কারও কাছে তিনি ছিলেন একজন অপরাধী, যিনি প্রতিশোধের নামে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। আবার অন্যদের কাছে তিনি ছিলেন এমন এক নারী, যিনি সামাজিক নিপীড়ন, বর্ণবৈষম্য ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
ফুলন দেবীর জীবন ভারতীয় সমাজের বহু জটিল বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে—দারিদ্র্য, বর্ণপ্রথা, নারীর প্রতি সহিংসতা, বিচারহীনতা এবং ক্ষমতার অসম বণ্টন। তার জীবনকাহিনি শুধু একজন ব্যক্তির গল্প নয়; এটি এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে নির্যাতন, প্রতিরোধ ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।