ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬,
সময়: ১১:৩৯:৩২ PM

সহিদুল ইসলামের অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
02-06-2026 09:22:19 AM
সহিদুল ইসলামের অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা সহিদুল ইসলামকে ঘিরে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে কর্মরত অবস্থায় তিনি ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শত শত কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন। প্রতিবেদনে তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটির টাকা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সহিদুল ইসলামের নামে, তার স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির নামে এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের নামে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক ফ্ল্যাট, প্লট, ভবন, দোকান ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সন্ধান পাওয়া গেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

বসুন্ধরায় ২০ ফ্ল্যাটের নিজস্ব ভবন

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা-এর জি ব্লকে ‘শেল কবিতা’ নামে ১০ তলা একটি ভবনের মালিক সহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রী। ভবনটিতে প্রতি তলায় দুটি করে মোট ২০টি ফ্ল্যাট রয়েছে। স্থানীয় রিয়েল এস্টেট সংশ্লিষ্টদের মতে, এলাকাটিতে প্রতিটি ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা বা তারও বেশি। সে হিসেবে শুধুমাত্র এই ভবনের ফ্ল্যাটগুলোর মূল্যই ১০০ কোটির টাকার কাছাকাছি হতে পারে। জমির মূল্য যুক্ত করলে সম্পদের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়।

বর্তমানে সহিদুল দম্পতি এই ভবনেই বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আরও ৩৩টি ফ্ল্যাট

বসুন্ধরার বাইরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সহিদুল ইসলাম, তার স্ত্রী এবং আত্মীয়স্বজনদের নামে আরও ৩৩টি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলামোটর এলাকার স্বজন টাওয়ারে সহিদুল ইসলামের নামে দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা। এছাড়া রূপনগর এলাকার আরামবাগ আবাসিক অঞ্চলে তার স্ত্রীর নামে একটি ছয়তলা ভবন রয়েছে, যেখানে ১০টি ফ্ল্যাট রয়েছে। এসব ফ্ল্যাটের সম্মিলিত মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এছাড়া ইস্কাটন এলাকার গার্ডেনিয়া টাওয়ারে ফাহমিদা রাব্বির নামে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ৪ কোটি টাকা।

মিরপুরে ভবন ও জমির মালিকানা

মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিং দ্বিতীয় প্রকল্পে সহিদুল ইসলামের স্ত্রীর নামে একটি ছয়তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০টি ফ্ল্যাটসমৃদ্ধ ভবনটির বাজারমূল্য ২০ কোটির টাকারও বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।

পরে ভবনটি তার চার শ্যালকের নামে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে নথিপত্রে দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হলেন কাজী মুক্তাদীর ইবনে মিনান, কাজী মুতামিদ ইবনে মিনান, কাজী মুত্তাকী ইবনে মিনান এবং কাজী মুস্তাকীম ইবনে মিনান।

সব মিলিয়ে সহিদুল, তার স্ত্রী এবং আত্মীয়দের নামে থাকা ৫৩টি ফ্ল্যাট ও দুটি দোকানের বাজারমূল্য অন্তত ১৬২ কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

জমি ও শিল্পকারখানায় বিনিয়োগ

ইস্টার্ন হাউজিং এলাকার দুটি প্লটে প্লাস্টিক কারখানা ভাড়া দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ আয়তনের এই জমির বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।

এছাড়া মিরপুর বেড়িবাঁধ সংলগ্ন গড়ানচটবাড়ি এলাকায় ৩৩ শতাংশ জমির মূল্য অন্তত ৩০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিউমার্কেট ও আজিজ সুপার মার্কেটে দোকান

রাজধানীর বাণিজ্যিক এলাকাতেও সহিদুল ইসলামের বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। আজিজ সুপার মার্কেট-এ তার নামে একটি দোকান রয়েছে, যার মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। এছাড়া নিউমার্কেট এলাকায় আরেকটি দোকানের মূল্যও ২ কোটির টাকার বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।

সাভারে বাংলোবাড়ি ও বিপুল জমি

ঢাকার বাইরে সাভার-এর মধুমতি মডেল টাউনে ‘সেঁজুতি’ নামে একটি বাংলোবাড়ির মালিকানার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ৩৫ কাঠা জমির ওপর নির্মিত এই বাড়ির জমির মূল্যই প্রায় ১০ কোটি টাকা বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

একই প্রকল্পে সহিদুল ইসলামের মালিকানায় পাঁচটি পৃথক প্লট রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্লটের মধ্যে গ্যারেজ, পশুর খামার এবং ভারী যন্ত্রপাতির সংরক্ষণাগার হিসেবে ব্যবহৃত জমিও রয়েছে। সব মিলিয়ে মধুমতি মডেল টাউনে তার জমির মূল্য অন্তত ৯০ কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

পূর্বাচলে ছয়টি প্লট

পূর্বাচল এলাকায় সহিদুল দম্পতির নামে ছয়টি প্লটের তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন মৌজায় অবস্থিত এসব জমির সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৬২ কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া কালীগঞ্জ এলাকায় তার নামে ১৫ শতাংশ জমির মালিকানার তথ্যও পাওয়া গেছে, যার মূল্য এক কোটির টাকার বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শেয়ারবাজারে ৮০ কোটি টাকার বিনিয়োগ

স্থাবর সম্পদের পাশাপাশি অস্থাবর সম্পদেও উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহিদুল ইসলামের স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির নামে একটি বিও অ্যাকাউন্টে প্রায় ৮০ কোটি টাকার শেয়ারবাজার বিনিয়োগ রয়েছে।

এছাড়া একটি ব্যাংক হিসাবেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নগদ অর্থ জমা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

ছেলের ব্যবসায় বিনিয়োগ

সহিদুল ইসলামের ছেলে হাসিন ফারহানের নামে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্যও উঠে এসেছে। রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকার একটি বাণিজ্যিক ভবনে অফিস নিয়ে তিনি স্থাপত্য, ইন্টেরিয়র ডিজাইন ও মার্কেটিং ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক বিনিয়োগের জন্য সহিদুল ইসলাম অন্তত ৫ কোটি টাকা প্রদান করেছেন।

আয় ও সম্পদের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান

প্রতিবেদনে কাস্টমস ও কর প্রশাসনের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তাদের মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তার চাকরিজীবনের পুরো সময়ে বেতন, ভাতা, বিদেশ সফর ও অবসর সুবিধা মিলিয়ে মোট বৈধ আয় কয়েক কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।

সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যয় বাদ দিলে একজন কর্মকর্তার পক্ষে সর্বোচ্চ আড়াই থেকে তিন কোটি টাকার মতো সঞ্চয় করা সম্ভব। সেই তুলনায় সহিদুল ইসলাম ও তার পরিবারের নামে শত শত কোটি টাকার সম্পদের তথ্য স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

তদন্তের দাবি

এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার। সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস, কর পরিশোধের অবস্থা এবং সম্পদ অর্জনের বৈধতা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বা নির্দোষ বলা যায় না।

তবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত বিপুল সম্পদের অভিযোগ জনমনে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে। যদি অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অবৈধ সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

উল্লেখ্য, উপরোক্ত তথ্যসমূহ একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশিত দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য, তদন্ত সংস্থার চূড়ান্ত অনুসন্ধান এবং আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।