ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬,
সময়: ১১:৪০:০৩ PM

এনবিআর সদস্যর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
02-06-2026 08:09:23 PM
এনবিআর সদস্যর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসন শাখার সদস্য মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, প্রভাব খাটিয়ে পদায়ন এবং অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধান চালিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় বা আনুষ্ঠানিক তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘ কর্মজীবনে মোয়াজ্জেম হোসেন দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাস্টমস ও ভ্যাট কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। সমালোচকদের দাবি, তিনি দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় তৈরি করেন। অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের পদায়ন নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে নিয়োগের ক্ষেত্রে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কিছু শিল্পগোষ্ঠীর মালিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের কাছ থেকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অর্থ গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে একটি অভিযোগে বলা হয়, দেশের একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর চেয়ারম্যানের কাছ থেকে তিনি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে ৩০ লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন। একইভাবে আরেকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তার কাছ থেকেও তিনি ৩০ লাখ টাকা গ্রহণ করেন বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, একজন রাজস্ব কর্মকর্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর এমন আর্থিক লেনদেন স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট অর্থ গ্রহণের পেছনে বৈধ কারণ ছিল কি না, সে বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে মোয়াজ্জেম হোসেনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সমালোচকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সম্পর্কের কারণে তিনি প্রশাসনিক ও পেশাগত ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো আদালত বা সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি।

অর্থপাচারের অভিযোগও আলোচিত হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার ছেলের যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার ব্যয় নির্বাহের জন্য হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, প্রতি সেমিস্টারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শিক্ষাব্যয় বহন করা হলেও সেই অর্থের বৈধ উৎস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোর এলাকায় একটি বাড়ি কেনার অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। দাবি করা হয়, সম্পত্তিটি তার নিজের নামে নয়, বরং পরিবারের সদস্যদের নামে নিবন্ধিত। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারি তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।

দেশে বিভিন্ন স্থানে সম্পদ অর্জনের অভিযোগও প্রতিবেদনে এসেছে। অভিযোগ অনুসারে, নোয়াখালী, ঢাকা, পূর্বাচল, জলসিড়ি ও ডিওএইচএস এলাকায় তার নামে বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে একাধিক স্থাবর সম্পদ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে। অনুসন্ধানকারী সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস এবং ব্যাংক হিসাবের লেনদেন যাচাইয়ের জন্য বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন।

ঢাকা কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। একটি অভিযোগে বলা হয়েছে, শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে আটক একটি আমদানি চালান ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি প্রভাব খাটিয়েছিলেন। আরেকটি ঘটনায় বিপুল পরিমাণ মেমরি কার্ড জব্দ হওয়ার পর তা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে তদন্তের দাবি উঠলেও অভিযোগকারীদের মতে, মূল দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় বা সরকারি তদন্তের ফলাফল প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।

যশোর ভ্যাট কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কয়েকটি বিড়ি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে ভুয়া মামলার ভয় দেখিয়ে ঘুষ আদায়ের অভিযোগে কয়েকজন অধস্তন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেন, মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা দায়মুক্তি পেয়েছেন।

রাজশাহী ভ্যাট কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একটি শিল্পগোষ্ঠীর ভ্যাট ফাঁকির তদন্তকে কেন্দ্র করে ঘুষ দাবির অভিযোগও সামনে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শত শত কোটি টাকার ভ্যাট অনিয়মের তদন্ত চলাকালে মামলার নিষ্পত্তির জন্য অবৈধ আর্থিক সুবিধা চাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।

এছাড়া এনবিআরের অভ্যন্তরে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের একটি অনিয়মিত প্রক্রিয়া গড়ে উঠেছিল এবং এতে মোয়াজ্জেম হোসেনের প্রভাব ছিল। আরও অভিযোগ রয়েছে যে, বিভিন্ন কাস্টমস ও ভ্যাট দপ্তর থেকে নিয়মিত ঘুষ আদায়ের মাধ্যমে একটি নেটওয়ার্ক পরিচালিত হতো। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের ফলাফল এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

সার্বিকভাবে, মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, প্রভাব খাটানো, স্বার্থের সংঘাত এবং অর্থপাচারের মতো গুরুতর বিষয়কে কেন্দ্র করে। তবে আইনের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তি আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপরাধী বলা যায় না। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া জরুরি।