বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চুরি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি বর্তমানে সবচেয়ে ভয়াবহ সামাজিক সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শিশুধর্ষণ, যৌন নির্যাতন এবং নির্যাতনের পর হত্যার ঘটনা। মানবাধিকার সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির পর থেকে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারহীনতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, সামাজিক অবক্ষয় এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবই এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে ১৮১ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়। ডিসেম্বরে এ সংখ্যা কমে ১৫৯ জনে দাঁড়ালেও ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সমানভাবে ১৮৩ জন নির্যাতনের শিকার হন। এরপর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। মার্চ মাসে নির্যাতনের শিকার হন ১৯০ জন এবং এপ্রিলে এ সংখ্যা বেড়ে ২২০ জনে পৌঁছে, যা গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। মে মাসের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ না হলেও সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, ওই মাসের সংখ্যা এপ্রিলকেও অতিক্রম করতে পারে।
বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানেও একই ধরনের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গত বছরের নভেম্বরে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ১ হাজার ৭৪৪টি। ডিসেম্বরে তা কমে ১ হাজার ২৪৮ এবং জানুয়ারিতে ১ হাজার ২৮১টিতে নেমে আসে। ফেব্রুয়ারিতে সর্বনিম্ন ১ হাজার ১৮১টি ঘটনা রেকর্ড করা হলেও মার্চে তা বেড়ে ১ হাজার ৪৮৫ এবং এপ্রিলে ২ হাজার ১১টিতে পৌঁছায়। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির তুলনায় এপ্রিলে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অপরাধপ্রবণ এলাকার তালিকায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ঢাকা রেঞ্জ। শিল্পাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন এলাকাগুলোতে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে ঢাকা রেঞ্জে ৩৭৫টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ২৮৫টি এবং রাজশাহী রেঞ্জে ২৫২টি নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে ঢাকা মহানগর এলাকাতেও অপরাধের হার ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
বিশেষ করে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনা সমাজে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতি মাসে ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার গড় সংখ্যা ছিল ৩০ থেকে ৪৫-এর মধ্যে। কিন্তু মার্চে তা বেড়ে ৫৭ এবং এপ্রিলে ৫৮ জনে পৌঁছায়। শুধু এপ্রিলে ১৭ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। একই সঙ্গে ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে যেখানে তিনটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, সেখানে এপ্রিলে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ১২-তে।
নারী ও শিশু হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও উদ্বেগজনক। মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে ৫৭ জন নারী ও কন্যাশিশু হত্যার শিকার হন, যার মধ্যে ১৬ জন ছিল শিশু। জানুয়ারিতে নিহতের সংখ্যা ছিল ৫৫ জন। যদিও ফেব্রুয়ারি ও মার্চে এই সংখ্যা কিছুটা কম ছিল, তবুও সামগ্রিক চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে নারী ও শিশু পাচারের ঘটনাও বাড়ছে। ফেব্রুয়ারিতে ২০ জন কন্যাশিশুসহ মোট ৪০ জন পাচারের শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যানও একই ধরনের চিত্র তুলে ধরেছে। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ১৯৯টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৯৪টি ছিল ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের শিকার শিশুদের মধ্যে ১৬ জনের বয়স ছিল ছয় বছরের কম এবং ৪০ জনের বয়স ছিল সাত থেকে বারো বছরের মধ্যে। একই সময়ে ১১৫টি শিশু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। শারীরিক নির্যাতনের কারণে ৩৪ জন এবং পারিবারিক সহিংসতার কারণে ২৫ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ধর্ষণের পর ১১ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে এবং দুজন শিশু সামাজিক লজ্জা ও মানসিক চাপে আত্মহত্যা করেছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের এই ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতির জন্য বিচারহীনতাকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। নারীমুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্তের মতে, একটি অপরাধের বিচার না হলে আরও অনেক অপরাধের সুযোগ সৃষ্টি হয়। অপরাধীরা যখন দেখে যে তারা প্রভাব খাটিয়ে বা বিচারব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন তারা পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি মাদকাসক্তি, জুয়া, বেকারত্ব এবং সামাজিক অবক্ষয়ও অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফাওজিয়া মোসলেম মনে করেন, সমাজে অপরাধীদের প্রভাব ও ক্ষমতার দাপট বেড়ে যাওয়ায় অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাংস্কৃতিক চর্চার অভাব, শিক্ষার অবনতি, নারী বিদ্বেষী মনোভাব এবং সামাজিক অস্থিরতা মানুষের আচরণকে আরও হিংস্র করে তুলছে। ফলে অপরাধীরা শাস্তির ভয় হারিয়ে ফেলছে এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা জোরদার এবং পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। অন্যথায় নারী ও শিশু নির্যাতনের এই ভয়াবহ প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং সমাজের নিরাপত্তা ও মানবিক মূল্যবোধ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।