আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ঘিরে দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সরকার জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার বাড়ানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে বড় আকারের বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং করব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবলমাত্র উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই বিনিয়োগ বৃদ্ধি সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং ব্যবসাবান্ধব প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাত এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ে সরকারের সুস্পষ্ট ও কার্যকর অবস্থান থাকা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে বেসরকারি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে না।
ড. জাহিদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমে গেছে। তিনি মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আর্থিক ও মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম অন্তরায়। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, সুশাসনের ঘাটতি এবং আর্থিক খাতের অনিয়ম ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে। এ কারণে ব্যাংকিং খাতে সংস্কার, ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কার্যকর নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যাতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম এবং শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।
আসন্ন বাজেট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রণয়ন করা প্রয়োজন। অনেক সময় উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জন করা সম্ভব হয় না। ফলে বাজেট বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টি হয় এবং উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তাই রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
করব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে ড. জাহিদ হোসেন উল্লেখ করেন, দেশের করনীতি এখনো অনেক ক্ষেত্রে জটিল এবং করদাতাবান্ধব নয়। করের হার নির্ধারণ, কর অব্যাহতি এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব অনেক সময় বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। তিনি করনীতিকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, করদাতাদের জন্য সহজ সেবা নিশ্চিতকরণ এবং কর ফাঁকি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে হলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা ছাড়াও নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিগত পরিবেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন। তাই শিল্পনীতি, করনীতি, বাণিজ্যনীতি এবং আর্থিক খাতের নীতিগুলোতে ঘন ঘন পরিবর্তনের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সার্বিকভাবে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। সরকার বিনিয়োগের হার বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও তা বাস্তবায়নের জন্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে শৃঙ্খলা এবং করব্যবস্থার আধুনিকায়ন অপরিহার্য। ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলেই বাজেটের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবে রূপ পেতে পারে। অন্যথায় লক্ষ্য নির্ধারণ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।