২০২৬ সালে বন্ধু দিবস দুটি ভিন্ন দিনে পালিত হয়েছে। ৩০ জুলাই জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস এবং ২ আগস্ট (আগস্ট মাসের প্রথম রবিবার) বাংলাদেশ ও ভারতে পালিত জাতীয় বন্ধুত্ব দিবস।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের টাইমলাইনে যখন 'হ্যাপি ফ্রেন্ডশিপ ডে'-র বাঁধাধরা বার্তা আর নির্বাচিত কিছু মুখচ্ছবির মেলা বসেছে তখন একটু থেমে চিন্তা করতে ইচ্ছে হলো। বন্ধুত্ব শব্দটার সীমানা আসলে কতটুকু। আমরা কি একে কেবল দু-চারজন মানুষের সাথে আড্ডা, ঘোরাঘুরি আর বিপদে পাশে পাওয়ার অতি-সংকীর্ণ এক গণ্ডিতে বন্দি করে ফেলিনি? বন্ধুত্বের প্রচলিত সংজ্ঞায় যে প্রথাগত ছাঁচ দাঁড় করানো হয়েছে তাকে প্রশ্ন করলে এক ভিন্ন সত্যি সামনে আসে। সংজ্ঞার ফ্রেমে বাঁধার মুহূর্তেই বন্ধুত্ব তার আসল সৌন্দর্য হারায়। এক অর্থে তা হয়ে ওঠে এক 'ফেইক টার্ম' বা কৃত্রিম ধারণা। সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব পারস্পরিক আধিপত্য বিস্তারকারী কতগুলো শব্দমালা। বাস্তবতা হলো যেকোনো মানবিক সম্পর্কের গভীরে একটি নীরব বন্ধুত্ব লুকিয়ে থাকে। কখনো কখনো বাহ্যিক সম্পর্কটি হোক তা পারিবারিক বা রক্তের কিংবা অফিসের বস বা অধস্তনের সাথে যা কিনা বন্ধুত্বকে ছাড়িয়ে সম্পর্কের ধারণাকে প্রধান করে তোলে আবার কখনো এসব সম্পর্কের আড়ালে ভেতরের বন্ধুত্বটাই বাহ্যিক সম্পর্ককে শাসন করে। এটি পুরোটাই নির্ভর করে সেই সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা দুটি আত্মার মানসিক পরিপক্বতা এবং পরস্পরের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। অর্থাৎ সম্পর্ক ডমিন্যান্ট হবে না বন্ধুত্ব তা পারস্পরিক একটি আপেক্ষিক বিষয়। কখনো সম্পর্ক বন্ধুত্বকে শাসন করে আবার কখনো কখনো বন্ধুত্ব সম্পর্ককে শাসন করে। প্রকট বা প্রচ্ছন্নভাবে বন্ধুত্ব থাকবেই। সবকিছুকে মানবিক বিচারে পরম সম্মানের সাথে, গভীর ভালোবাসা দিয়ে গ্রহণ করার নামই তো বন্ধুত্ব। অন্যভাবে বলা যায় খাঁটি মানবিক সম্পর্কের অপর নামই বন্ধুত্ব।
কাউকে চেনা, কারো সাথে গল্প করা, চা বা কফির কাপে আড্ডা দেওয়া কিংবা সাময়িক প্রয়োজনে পাশে পাওয়াকে সরাসরি "বন্ধুত্ব" বলা অনেকটা ভুল। এগুলো মূলত যাপিত জীবনের পথচলায় সঙ্গের নির্ভরতা (Dependence on Companionship)।
যেখানে মানুষের সাথে মানুষের পক্ষপাতিত্ব আছে, দলীয় সংকীর্ণতা আছে, পেশাগত ইজমের ভালোলাগা ভালোবাসা আছে কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের বিচার-বিবেচনার ভিত্তিতে আচরণ নির্ধারিত হয় সেখানে যাই থাকুক না কেনো তাকে বন্ধুত্ব বলা চলে না। বন্ধুত্ব কোনো নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা বিষয় নয়। মানুষের সুগভীর প্রয়োজনে প্রকৃতির সাথে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাকেও বন্ধুত্ব বলা চলে। ঘরের দুয়ার পেরিয়ে বের হলে পাড়া-প্রতিবেশীর সাথে সংযোগ,অচেনা পথের পথিকের সাথে এক মুহূর্তের সহমর্মিতা,বৃক্ষ, প্রাণী কিংবা আস্ত প্রকৃতির সাথে আত্মার মেলবন্ধন,
পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানবিক বন্ধনই বন্ধুত্ব।
আমরা ছোটবেলায় ভেবেছিলাম স্কুলাঙ্গনের সেই কাঁধে হাত রেখে হেঁটে চলা হয়তো সারাজীবন থেকে যাবে। কিন্তু শৈশব পেরিয়ে অ্যাডাল্টহুড বা প্রাপ্তবয়স্কতার কঠোর বাস্তবে পা রাখতেই আমাদের ফ্রেন্ডশিপ মোডের ভার্সন আপডেট হতে থাকে। বাস্তবতা হলো বড় হওয়ার সাথে সাথে ফ্রেন্ডলিস্ট ছোট হতে থাকে। একসময় প্রতিদিনের দীর্ঘ আড্ডা রূপান্তরিত হয় বছরে দু-একটা ফরমাল মেসেজ কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের নীরবতায়। নোটিফিকেশনের যুগে এসে আমরা সবাই কানেক্টেড কিন্তু ভীষণ রকম ডিসকানেক্টেড। এখন বন্ধুত্বের গভীরতা মাপা হয় না ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বিনিময় দিয়ে বরং মাপা হয় "কিরে, কেমন আছিস?" লিখে কয়েক মাস পর পাঠালেও অপরপ্রান্তের মানুষটি আগের সেই আবেগ অনুভূতি নিয়েই উত্তর দিচ্ছে কি না তার ভিত্তিতে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় সোশ্যাল এনট্রপি। মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলা বা এন্ট্রপি যেমন দিন দিন বাড়ছে বয়সের সাথে মানুষের একাকীত্বও বাড়ছে। তবে সব সামাজিক গোলযোগের মাঝে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা আর একজন নিঃস্বার্থ বন্ধুর পাশাপাশি নীরবে বসে থাকাটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় থার্মোডাইনামিক সাম্যাবস্থা (Thermodynamic Equilibrium)। অ্যারিস্টটল তাঁর Nicomachean Ethics এ বন্ধুত্বকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছিলেন অর্থাৎ সুবিধার বন্ধুত্ব, আনন্দের বন্ধুত্ব এবং গুণের (Virtue) বন্ধুত্ব। প্রথম দুটি সাময়িক, কিন্তু তৃতীয়টি অমর। অ্যারিস্টটলের সেই বিখ্যাত উক্তি আজও প্রাসঙ্গিক: "বন্ধুত্ব হলো দুটি শরীরে বসবাসকারী একটি একক আত্মা।" ফরাসি দার্শনিক মিশেল দ্য মন্তেন তাঁর বন্ধু এতিয়েন দ্য লা বোয়েতির কথা স্মরণ করে লিখেছিলেন—"যদি আমাকে প্রশ্ন করা হয় কেন আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম তবে আমার একমাত্র উত্তর হতে পারে কারণ সে ছিল সে, আর আমি ছিলাম আমি।" এই যে একে অপরের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেও মিলে যাওয়া এটাই বন্ধুত্বের আসল সরূপ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'শেষের কবিতা'য় অমিত ও লাবণ্যের সম্পর্কের যে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক রূপ এঁকেছিলেন তা শুধু প্রেমে সীমাবদ্ধ নয় বন্ধুত্বেরও এক মহাজাগতিক দর্শন। আবার জীবনানন্দ দাশ যখন লেখেন ধানসিঁড়িটির তীরের কথা সেখানেও প্রকৃতি ও মানুষের বন্ধুত্বের এক চিরন্তন তৃষ্ণা কাজ করে।
আজকের আধুনিক অস্তিত্ববাদী দর্শনে বন্ধুত্ব হলো মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। ফরাসি অস্তিত্ববাদী আলবেয়ার কামু বলেছিলেন:
"আমার সামনে হেঁটো না, আমি হয়তো অনুসরণ করব না। আমার পেছনে হেঁটো না, আমি হয়তো নেতৃত্ব দেব না। শুধু আমার পাশে হাঁটো এবং আমার বন্ধু হও।"
ইতিহাসের পাতায় সর্বজনীনতার পাঠ
বন্ধুত্ব যে কেবল দুজন নির্দিষ্ট মানুষের চারদেওয়ালে বন্দি কোনো বিষয় নয় এর ঐতিহাসিক ভিত্তিও তাই বলে। ১৯৫০-এর দশকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েতে এই বিশেষ দিনটি উদযাপনের যে সূচনা হয়েছিল তার পেছনে ছিলেন ড. র্যামন আর্টেমিও ব্রাচো নামের একজন চিকিৎসক।
তিনি বিশ্বাস করতেন সমাজে প্রকৃত সুখ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় এই সর্বজনীন সংযোগ দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে। ড. ব্রাচোর ভাবনায় প্রেম, ভালোবাসা আর সখ্য কেবল দুজন নর-নারীর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকার বস্তু নয়। তা ছড়িয়ে পড়বে পরিবারে, সমাজে, সবার মাঝে আর পুরো সমাজই হয়ে উঠবে ভালোবাসায় সিক্ত এক বন্ধুত্বময় পৃথিবী।
ভালোবাসায় বাঁচুক সংকোচহীন বন্ধন।
আমরা প্রতিনিয়ত বন্ধুত্বকে নিজেদের স্বার্থ আর সংজ্ঞার সংকীর্ণতায় ছোট করে ফেলেছি। অথচ এর ব্যাপ্তি অসীম। জীবনকে সার্থক করতে হলে আমাদের সম্পর্কের সমীকরণটিকে সহজ করতে হবে। সঙ্গের নির্ভরতায় জাগ্রত থাকবে অকৃত্রিম ভালোবাসা আর সেই ভালোবাসার পরতে পরতে লুকিয়ে থাকবে বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব কোনো নির্দিষ্ট ফ্রেমে বাঁধা রূপকথা নয় এটি সর্বজনীন, সীমানাহীন এবং চিরন্তন। সংকুচিত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে জীবন আর মহাবিশ্বের প্রতিটি মানবিক স্পন্দনকে বন্ধুত্বের উষ্ণতায় জড়িয়ে নেওয়ার ইচ্ছেতেই শুভ হোক সর্বজনীন বন্ধুত্ব দিবস!
লেখক : কবি, সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও এমফিল গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।