বাংলাদেশের চিকিৎসক সমাজে পরিচিত একটি নাম ডা. জোবাইদা রহমান। একজন চিকিৎসক হিসেবে তাঁর শিক্ষা, পেশাগত সাফল্য এবং ব্যক্তিগত জীবন দীর্ঘদিন ধরেই জনআলোচনার অংশ। চিকিৎসা পেশায় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি তিনি মানবসেবাকে জীবনের অন্যতম আদর্শ হিসেবে ধারণ করেছেন বলে তাঁর পরিচিতজনরা উল্লেখ করেন। শান্ত, ভদ্র ও বিনয়ী স্বভাবের অধিকারী হিসেবে পরিচিত জোবাইদা রহমান সবসময় মানুষের কল্যাণে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
জোবাইদা রহমানের জন্ম ১৮ জুন ১৯৭২ সালে সিলেটে। তিনি একটি সুপরিচিত ও শিক্ষিত পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তাঁর বাবা রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান বাংলাদেশের নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি যোগাযোগ ও কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। তাঁর মা সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আছেন। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী তাঁর কাকা এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক মহাসচিব বর্তমানে জাতিসংঘের বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান তাঁর চাচাতো বোন।
শিক্ষাজীবনে জোবাইদা রহমান ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনে মেডিসিন বিষয়ে অধ্যয়ন করেন এবং এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে তিনি একজন সফল চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৯৫ সালে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে তিনি সরকারি চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। চিকিৎসা পেশায় তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে চিকিৎসা নিতে না পারা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। চিকিৎসাসেবাকে তিনি কেবল একটি পেশা নয়, বরং মানবকল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৯৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তাঁর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিয়ে হয়। তাঁদের একমাত্র কন্যা জাইমা রহমান। ২০০৮ সালে তারেক রহমানের চিকিৎসার জন্য তিনি শিক্ষাছুটি নিয়ে যুক্তরাজ্যে যান। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন সেখানেই অবস্থান করেন। ২০২৫ সালের মে মাসে প্রায় ১৭ বছর পর তিনি দেশে ফিরে আসেন।
রাজনৈতিকভাবে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর পরিবারের সদস্য হলেও সরাসরি সক্রিয় রাজনীতিতে কখনই যুক্ত ছিলেন না। বিভিন্ন সময়ে তাঁর রাজনীতিতে আসা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক মন্ত্রিসভার বৈঠকে মন্তব্য করেছিলেন যে, জোবাইদা রহমান শিক্ষিত ও ভালো পরিবারের মেয়ে এবং তিনি রাজনীতিতে এলে তা ইতিবাচক হতে পারে। তবে জোবাইদা রহমান নিজে দীর্ঘ সময় চিকিৎসা পেশাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
তাঁর পরিচিতজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সবসময় সংযত ও মার্জিত আচরণে বিশ্বাসী। ব্যক্তি বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সম্পর্কে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়ার পরিবর্তে তিনি সৌজন্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখেছেন। জনকল্যাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানুষের উপকারে কাজ করার বিষয়গুলোই তাঁর চিন্তা ও কর্মের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তুলে ধরা হয়।
তবে তাঁর জীবন সম্পূর্ণ বিতর্কমুক্ত ছিলেন। তারপরেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ২০০৮ সালে জ্ঞাত আয়ের বাইরে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর, তাঁর স্বামী তারেক রহমান এবং তাঁর মায়ের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় নিম্ন আদালত তাঁকে তিন বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করেন। পরে ২০২৪ সালে আদালত সেই সাজা ও অর্থদণ্ড স্থগিত করেন। এরপর ২০২৫ সালের ২৮ মে মামলায় তিনি বেকসুর খালাস লাভ করেন।
একই সময়ে শিক্ষাছুটি শেষে সরকারি চাকরিতে যোগ না দেওয়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। দেশে ফেরার পর তাঁকে পুনর্বহালের সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে আলোচনা ও গুঞ্জন দেখা গেলেও এ বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভরশীল।
জোবাইদা রহমানের জীবন ও কর্মে চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা এবং মানবকল্যাণের বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। একজন চিকিৎসক হিসেবে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার তাঁকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবার এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হওয়ায় জনজীবনে তাঁর কর্মকাণ্ডও বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে চিকিৎসা, সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতে তিনি চিকিৎসা, সমাজসেবা কিংবা জনজীবনের অন্য কোনো ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা এবং মানবসেবার আদর্শ—এই তিনটি বিষয়ই জোবাইদা রহমানের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।